Thursday, February 27, 2020

Delhi Violence স্বজনহারা: দিল্লিতে সংঘর্ষে নিহত মুদাস্‌সর খানের দেহ ঘিরে হাহাকার। বৃহস্পতিবার। রয়টার্স ‘‘ওই যে রাজধানী পাবলিক স্কুলটা দেখছেন, তার ছাদে ইট-পাথর-অ্যাসিড-পেট্রল বোমা জমা করেছিল ওরা। ছাদে লোহার রড গেঁথে বিরাট গুলতি বানিয়েছিল। আমরা নীচ থেকে ইট-পাথর ছুড়ছিলাম। ওরা তিন-চারজন মিলে গুলতিতে টান দিয়ে বড় বড় পাথর গোলার মতো ছুড়ছিল।’’ আমরা আর ওরা! এক দিকে শিবপুরী। অন্য দিকে মুস্তাফাবাদ। আশপাশের পুড়ে যাওয়া বাড়ি, দোকানের ভিতর থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে কালো ধোঁয়া উঠছে। সারি সারি গাড়ির পোড়া কঙ্কাল। বাড়ির গায়ে, পুড়ে যাওয়া কাঠের দরজায় গুলির দগদগে ক্ষত। মাঝখানের রাস্তাটা স্থানীয়দের কাছে ‘ইন্ডিয়া-পাকিস্তান বর্ডার’। সত্যিই যেন ‘সংঘর্ষবিধ্বস্ত সীমান্ত’। সেই ‘সীমান্তে’ দাঁড়িয়ে বছর তিরিশের রাজু বাদোরিয়া সোম-মঙ্গলবারের সংঘর্ষের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। রাজুর চশমার নীচে, নাকে, হাতে-পায়ে চোটের দাগ। পাথর এসে লেগেছিল। এত ঝুঁকি নিয়ে পাথর ছুড়ছিলেন কেন? এক মুহূর্ত না-থেমে রাজু জবাব দেন, ‘‘মুস্তাফাবাদে ওদের মসজিদে আগুন ধরানো হয়েছিল। তাই ওরা আমাদের মন্দিরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার মতলব করছিল। নিজেদের মান-ইজ্জত বাঁচাতে পাথর ছুড়েছি।’’ এসব শুরু করল কে? রাজু আর জবাব খুঁজে পান না। ‘‘জানি না। কেন এসব শুরু হল, বুঝতে পারিনি এখনও।’’ মুস্তাফাবাদে ব্রিজপুরী মেন রোড দিয়ে ঢুকতেই ডান হাতে পরপর রাজধানী পাবলিক স্কুল ও ডিআরপি কনভেন্ট স্কুল। চারতলা রাজধানী স্কুলের সমস্ত কাচের জানলা ভাঙা। চার দিকে বই, পরীক্ষার খাতা, কাচের টুকরো ছড়িয়ে। গোটা স্কুল জুড়ে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, সেটা স্পষ্ট। স্কুলের মালিক ফয়জল ফারুক সকালে এসে সব দেখে, অশান্তির ভয়ে বাড়ি চলে গিয়েছেন। পাশের দোতলা ডিআরপি স্কুলেরও অর্ধেক পুড়ে ছাই। যে-সব টেবিল-চেয়ার, কাগজপত্র বাঁচানো গিয়েছে, সেগুলো খোলা মাঠে ডাঁই করে রাখা। সেই স্কুলের মালিক রূপচাঁদ শর্মা মাথায় হাত দিয়ে বসে। ‘‘সব তো শেষ হয়ে গেল। হাজারখানেক ছাত্রছাত্রী কোথায় যাবে? কোথায় পড়াশোনা করবে ওরা,’’ প্রশ্ন দিশাহারা রূপচাঁেদর। সোম-মঙ্গলবার টানা সংঘর্ষের পরে গত কাল থেকে উত্তর-পূর্ব দিল্লি জুড়ে পুলিশ, র‌্যাফ, আধাসেনার টহলদারি শুরু হয়েছে। জাফরাবাদ, মৌজপুর, গোকুলপুরীর অনেক এলাকাই আগের তুলনায় ‘শান্ত’। শান্তই বটে! দলে দলে পাড়া খালি করে পালাচ্ছেন মৌজপুরের বাসিন্দারা। শিবপুরী, মুস্তাফাবাদের মতো ভিতরের দিকে পাড়ায় পাড়ায় অশান্তি এখনও থামেনি। বৃহস্পতিবার দুপুরেই শিবপুরীর একটি ধর্মীয় স্থানে আগুন লাগানো হয়েছে। ফের পাথর ছোড়াছুড়ি হয়েছে। অটোর ভিতর থেকে অ্যাসিডের বোতল-সহ আটক করা হয়েছে চার যুবককে। শিবপুরী-মুস্তাফাবাদের মাঝখানের রাস্তা বরাবর বিরাট নালা। সোমবার থেকে নালা পারাপারের সমস্ত সেতু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কোথাও বেঞ্চ-চেয়ার-টেবিল, কোথাও বাঁশ-তারের জালের ব্যারিকেড। নালার একটি জায়গা ঘিরে রেখেছে পুলিশ। গাড়ি থেকেও নামতে দেওয়া হল না। কী ব্যাপার? মুস্তাফাবাদের বাসিন্দা হায়দর আলি নিজের পোড়া জামাকাপড়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘‘বলছে নাকি, ৩৮ জন মারা গিয়েছে। আমি বলছি, সংখ্যাটা আরও বেশি। ওই নালায় কত দেহ পড়ে রয়েছে, কেউ জানে না।’’ কারা করল এ-সব? হায়দর আশেপাশে আঙুল দেখিয়ে বলেন, ‘‘বেছে বেছে আমাদের দোকানগুলোয় আগুন লাগিয়েছে। বাড়ির ছাদে কাঁদানে গ্যাসের শেল ‘রাজধানী’ পেয়েছি। পুলিশের নয়, বেআইনি কাঁদানে গ্যাসের শেল। এ সব কোথা থেকে এল?’’ দিল্লি পুলিশের এক অফিসার বলেন, ‘‘অন্তত দু’দিন ধরে সংঘর্ষের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। না-হলে এত পেট্রল বোমা, বিরাট বিরাট গুলতি, অ্যাসিড, বন্দুক-গুলি জোগাড় করে ফেলা সম্ভব নয়।’’ টের পাননি কেন? পুলিশ অফিসার তেতো মুখে জবাব দেন, ‘‘টের পেয়েও কিছু করার ছিল না। দু’দিক থেকে ওই অ্যাসিডের বোতল, পেট্রল বোমা ছোড়া হলে কে কী করবে? মঙ্গলবারই এখানে এক এসএসবি জওয়ানের মুখে অ্যাসিড এসে পড়েছে।’’ স্কুলের ছাদে বোমা-পাথর জমা হল কী করে? রাজধানী পাবলিকের চৌকিদার মনোজ কালোনি হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন— ‘‘সোমবার সকালেও ছেলেমেয়েরা এসেছে। ক্লাস চলছিল। হঠাৎ মহল্লার সবাই এসে বলল, স্কুল ছুটি দিয়ে দিতে হবে। দুপুরে স্কুলের টেবিল-চেয়ার বার করে ওরা রাস্তায় ব্যারিকেড করে ফেলল। সাত ঘণ্টা স্কুলে আটকে ছিলাম। দানাপানিও জোটেনি। চার দিকে শুধু আগুন আর গুলি, বোমার শব্দ। ১৮ বছর আগে দিল্লিতে এসেছি। দেশের রাজধানী। স্কুলের নামও রাজধানী ছিল। সেই রাজধানীই নরক হয়ে উঠল!’’ -আন্দ বাজার

agitators
আগে কোনও দিন বিমানে চড়েননি তিনি। চোখে ভাল দেখেন না। রক্তচাপেরও সমস্যা রয়েছে। খাওয়া বলতে দিনে এক বার। তা-ও সামান্য। এ নিয়েই গত তিন দিনে শাহিন বাগের ‘দাদি’, বছর বিরাশির বিলকিস চষে ফেলেছেন পরপর তিনটি শহর! কেরল থেকে কলকাতার বিমানে ওঠার সময়ে সঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘অসুবিধা হবে না তো? এত ক্ষণ বসতে পারবেন?’’
মাথার ঘোমটা পরিপাটি করে টেনে নিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠে বৃদ্ধা বলেন, ‘‘গত ৭০ দিন ধরে তো শাহিন বাগেই বসে থাকলাম। বিমানে বসতে অসুবিধা কোথায়? ঠিক তো করেই নিয়েছিলাম, হয় মৃত্যুর পরে শাহিন বাগ থেকে উঠব, নয়তো দাবি পূরণ হওয়ার পরে।’’
স্বামী মারা গিয়েছেন ১১ বছর আগে। পাঁচ পুত্র ও পুত্রবধূ, ১৯ জন নাতি-নাতনির সংসার ছেড়ে গত আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে বিলকিসের ঘর শাহিন বাগ। এখন দেশের নানা প্রান্তে শুরু হওয়া সিএএ, এনআরসি, এনপিআর-বিরোধী আন্দোলনে উৎসাহ দিতে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। সঙ্গী কয়েক জন যুবক-যুবতী। বুধবার সেই সূত্রেই ‘দাদি’ পৌঁছেছেন কলকাতায়। আজ, শুক্রবার পার্ক সার্কাসের আন্দোলনস্থলে যাওয়ার কথা তাঁর। কমবয়সিদের সঙ্গে দৌড়ে পেরে উঠছেন? বৃদ্ধা বললেন, ‘‘চোখে একটু কম দেখি। তবে অসুবিধা হচ্ছে না। বরং স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সরকারকে এই জনবিরোধী আইন পাল্টাতেই হচ্ছে। যেখানেই যাচ্ছি সকলকে বলছি, কখনও না কখনও সেই সকাল আসবে, যখন আমাদের দাবি পূর্ণ হবে। তত দিন সকলে এক হয়ে বসে থাকো।’’
এখন দিল্লির যা পরিস্থিতি, তাতে কি শাহিন বাগে বেশি দিন বসা যাবে?
বৃদ্ধার সঙ্গী, শাহিন বাগের আন্দোলনকারী সোনু ওয়ারসি, সৈয়দ জাওয়াদের দাবি, কিছু লোকের উস্কানিমূলক মন্তব্যে হিংসা ছড়াচ্ছে। তাঁরা কোন দলের, সকলেই জানেন। শাহিন বাগে প্রথম থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে। সোনুর কথায়, ‘‘সরকার চাইলে জোর করে শাহিন বাগ থেকে লোকজনকে সরিয়ে দিতেই পারে। কিন্তু সংবিধান মেনে সরানো কঠিন। বলা হচ্ছে, আমরা রাস্তায় বসে আছি। কিন্তু আমাদের তো পার্ক বা স্কুল নেই। তাই রাস্তাতেই বসেছি।’’
শোনা যাচ্ছিল, শাহিন বাগের আন্দোলনকারীরা নাকি সমঝোতা করতে চান...! কথা থামিয়ে বিলকিসের সঙ্গে আসা শামসাদ বিবি বললেন, ‘‘কত ভাবে যে আমাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা হয়েছে! তুমি ঘরে শুয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ করছ, আর আমরা ঠান্ডায় বসে আছি, রোদে পুড়ছি! আমাদের কি বসে থাকার শখ রয়েছে?’’ শামসাদকে চুপ করিয়ে ‘দাদি’র জবাব, ‘‘এত কথা কীসের! শাহিন বাগে গুলি চলেছে, ছেলেরা বোরখা পরে এসে ঝামেলা করেছে। কিন্তু আমরা কিছুরই পরোয়া করি না।’’
তিন দিনে তিনটে শহর চষে ফেলা বৃদ্ধার চোখে-মুখে ক্লান্তি নেই। তাঁর কথায় উৎসাহিত হয়ে সঙ্গী যুবকেরা দেখালেন বুকের টি-শার্ট। তাতে লেখা, ‘শহরে শহরে শাহিন বাগ!’ এক জন বললেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট ২৩ মার্চ পর্যন্ত সময় দিয়েছে। তত দিন প্রাণপণ আন্দোলন চলবে। তার পরে যা রায় দেবে, মেনে নেব। কিন্তু শাহিন বাগ তুলে দিলেও সারা দেশে এর প্রভাব থেকে যাবে। ৭০ দিনের আন্দোলন আগামী ৭০ বছর দেশের রাজনীতিতে দিশা দেখাবে।
প্রতিবাদী: বেকবাগানের একটি অতিথিশালায় বিলকিস ও তাঁর সঙ্গীরা। বৃহস্পতিবার। ছবি: স্বাতী চক্রবর্তী

No comments:

Post a Comment