Saturday, April 25, 2020

বিষণ্ন পৃথিবীতে অচেনা রমজান

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ   


বিষণ্ন পৃথিবীতে অচেনা রমজান

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর কাছে একটি সম্মানিত মাস। এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সারা দিন রোজা রাখে সবাই। সন্ধ্যাবেলায় আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দুখী-দুস্থদের ইফতার দিয়ে আতিথেয়তা মুসলিম সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাতের বেলা দল বেঁধে অংশগ্রহণ করা হয় মসজিদে অনুষ্ঠিত তারাবির নামাজে। শাবান মাসের শেষ দিন রমজানের চাঁদ দেখতে পাড়া-মহল্লার শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের নারী-পুরুষের মন হয়ে থাকে উত্সুক। অন্তরে বিরাজ করে অন্য রকম আনন্দ-উচ্ছ্বাস। এমনই ছিল যুগ যুগ ধরে চলে আসা মুসলিম সংস্কৃতির প্রতিরূপ। এ ছাড়া রমজানকে ঘিরে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে আছে নানা সংস্কৃতি।
কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এবারের রমজান মুসলিমদের কাছে ভিন্ন রকম এক চিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির দরুন সবাই এখন ঘরবন্দি। দেশে দেশে চলছে লকডাউন ও কারফিউ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে মাসখানেক ধরে। মসজিদের নামাজেও বাইরের কারো অংশগ্রহণের অনুমতি নেই। জুমার নামাজও নিজের ঘরে আদায় করছে সবাই। পৃথিবীর ব্যস্ততম স্থানগুলোতে বিরাজ করছে পিনপতন নীরবতা। নেই মানুষের কোলাহল ও পদচারণ। এমন বিমর্ষ ও অচেনা পৃথিবীতে বছর ঘুরে হাজির হয়েছে পবিত্র রমজান।
‘এমন রমজান এর আগে পালিত হয়েছে কি না আমার ঠিক মনে পড়ছে না। অতীতে বিশ্বযুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা রকম সংকটময় মুহূর্ত অতিবাহিত হয়েছে। অতীতের ইতিহাস, সাহিত্য ও বিভিন্ন আর্কাইভের নথিতে দেখা গেছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দুর্যোগসহ যেকোনো কঠিন মুহূর্তেও মুসলিমরা রমজানের সময় এলে একত্রে ইবাদত করেছেন। সম্প্রতি আলজাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়ার ইনস্টিটিউট অব দ্য মালয় ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড সিভিলাইজেশনের গবেষক ফাইজাল মুসা বিষাদময় রমজান সম্পর্কে এমনটি বলেছেন।

যেভাবে বদলে গেল রমজান
মানুষের চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ থাকায় আগের মতো এবার রমজানের দিনগুলো উদ্যাপনের সুযোগ হবে না। ভোরবেলা সাহিরর সময় খাবার খেয়ে শুরু হয় রোজা। আবার সন্ধ্যাবেলা ইফতারের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। তবে মুসলিম সমাজে ইফতারের ব্যবস্থাপনা অনেকটা সামাজিক অনুষ্ঠানের মতো হয়ে থাকে। বিশেষত বহু স্থানে সমাজের দুস্থ-দরিদ্রদের মধ্যে ব্যাপক হরে খাবার পরিবেশন করা হয়। কিন্তু এবার সে রকম কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান হবে না। কভিড-১৯-এর সংক্রমণ প্রতিরোধে সব দেশেই সব ধরনের জমায়েত নিষেধ করা হয়েছে। সাহির ও ইফতারের সবটুকুই হবে পরিবারের সঙ্গে নিজের ঘরের ভেতর।

ঘরে তারাবি আদায়ের নির্দেশনা
বেশির ভাগ দেশে মসজিদের বদলে ঘরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি তারাবির নামাজও আদায় করতে বলা হয়েছে। সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনার  হারামাইনে জনসাধারণের উপস্থিতি ছাড়া তারাবির নামাজ সংক্ষিপ্তভাবে আদায় করা হচ্ছে। মিসরে ফতোয়া বোর্ড থেকেও ঘরে সব নামাজ আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জর্দানে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায়ে বারণ করা হয়েছে। ইরানেও সম্মিলিতভাবে নামাজ আদায় এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় মসজিদে সব রকম ধর্মীয় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানে পারস্পরিক দুই মিটার দূরত্ব বজায় রেখে মসজিদে নামাজের জন্য জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জেরুজালেমের বিখ্যাত আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ মুসলিমদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান হবে এবং সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবেশের অনুমতি থাকবে। যুক্তরাজ্যে মসজিদগুলোতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কোরআন তেলাওয়াত ও ধর্মীয় বক্তব্য সম্প্রচার করা হচ্ছে।

থাকছে না সবমুখর বাজার
মিসরে রমজানকেন্দ্রিক ইফতারসহ সব ধরনের জনসমাগমের সব কার্যক্রম নিষেধ করা হয়েছে। তা ছাড়া মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুরে রমজানের পুরো মাস ব্যস্ত থাকে খাদ্য ও বস্ত্রের অস্থায়ী জনপ্রিয় বাজার। এবার তা স্থাপনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এমনটি করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হচ্ছে। তবে আবুধাবিতে রমজান উপলক্ষে সীমিত সময়ের জন্য শর্ত সাপেক্ষে শপিং মল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের ১২৭টি তাঁবুতে তিন লাখ ৩৩ হাজার ইফতারের প্যাক ফ্রি বিতরণ করা হবে।

অনলাইনে সহযোগিতার আহ্বান
গরিব-দুখীদের জাকাত দেওয়া কিংবা দান করা অনেক বড় পুণ্যের কাজ। রমজানে বেশির ভাগ মুসলিম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যে এবারের রমজানে মসজিদে কিংবা কোনো ক্যাম্পে কোনো কিছু দেওয়া হবে না। বরং দরিদ্রদের ইফতার সামগ্রী ও সহযোগিতা সংস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হবে। সৌদি আরবে এবার মদিনার মসজিদে নববীতে কোনো ইফতারের ব্যবস্থা থাকবে না। নিরাপত্তাজনিত কারণে স্বাস্থ্য ও ধর্ম বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এনজিও সংস্থাকে অনলাইনের মাধ্যমে দানের অর্থ দিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ত্রাণ কার্যক্রমের সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সম্পন্ন করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে।

Wednesday, April 15, 2020

লঙ্ঘিতে হবে দুস্তর পারাবার

করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে সবার জীবনের বাস্তবতা। আমরা এখানে শুনছি পাঠকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার কথা। তাঁরা লিখছেন পরিবারের আনন্দ–বেদনাভরা গল্প। শোনাচ্ছেন এ সময়ের কোনো মানবিক সাফল্যের কাহিনি। প্রথম আলো মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে পাঠকের গল্প। দেশ বা প্রবাস থেকে আপনিও লিখুন আপনার অভিজ্ঞতার কথা। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com
চাকরির কারণে বাড়ি থেকে অনেক দূরে একা থাকি। বাড়ির কথা মনে হলেই রিমোট হাতে টেলিভিশনে সার্ফিং করি একটার পর একটা চ্যানেল। কপালে চিন্তার ভাঁজ। অন্ধকারময় সময় আরও নিঃসঙ্গতা নিয়ে আসে। কফি হাতে জানালার গ্রিলে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে সান্ত্বনা খুঁজি।

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে বাজছে। নিষ্প্রাণ শহরের চেহারা যে এত নিষ্প্রভ হতে পারে, আগে কখনো বুঝিনি। কখনো বসে বসে চিন্তিত মনে একা একা পায়চারি করি। কখনো মোবাইল ফোন হাতে খবরের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করি। ছোটবেলা থেকেই পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। টেলিভিশন আমাকে তেমন টানে না। কিন্তু ইদানীং টেলিভিশনের খবরটা কিংবা মোবাইলের আপডেট তথ্যই বারবার দেখার তাগিদ অনুভব করছি। পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়তেও মনটা সায় দেয় না। কত প্রিয় খবর পত্রিকার পাতা ভরে থাকত আগে। এখন করোনায় সব বিবর্ণ।

রাত যত ঘনিয়ে আসছে, মনটা ততই কেমন যেন করছে। কাছের মানুষজনদের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকি বলেই হয়তো স্থবিরতা আরও চেপে বসেছে। বয়স্ক মা-বাবাকে দূরে বাড়িতে রেখে এখানে অসহনীয় লাগছে। চাকরি সামলিয়ে চলতে গেলে অনেক কিছু গুটিয়ে আনতে হয়। প্রতিদিনের অভ্যাসমতো রাত জেগে জেগে রবীন্দ্রসংগীত শুনেও মনের অস্থিরতা কাটে না।

একটি বাড়িতে চারতলার চারটা ঘরে আমরা চারজন থাকি। আমি ছাড়া বাকি সবাই একান্ত নিরাপত্তার জন্য আপনজনদের কাছে চলে গেছেন। এখন তো এই ঘরটাই আমার নিরাপদ আশ্রয়। দশ–পনেরো দিন হলো মেসের রাঁধুনি আসছে না। আগে দুবেলা রান্না হতো। খেয়েদেয়ে দিন চলে যেত। সহকর্মী উত্তমদা বলতেন, সুন্দর রান্নাও একটা আর্ট। এক বেলা খেয়ে দুবেলার কাজ চালিয়ে দেওয়ার জন্য আলুই মোক্ষম। তা ছাড়া রাঁধুনি না আসায় নিঃসঙ্গতা আরও এক ধাপ বেড়েছে বৈকি!
সকালে ব্যাংকে যাওয়ার পর কখনো কখনো মনে হয়, মানুষের কাছে টাকার গুরুত্ব এখনো কত বড়। নইলে এই সময়ে ডিপিএস জমা দেওয়ার জন্য এত ভিড় ঠেলে মানুষ আসে! অফিস শেষে বাসায় ফিরি। দেখি দরকারি জিনিসপত্র ফুরিয়ে এসেছে। মাস্ক পরে মুদির দোকানে গেলাম। চিংড়ি নিয়ে এলাম মাছের বাজার থেকে। ফিরে এসে নতুন অভ্যাসে সাবান দিয়ে হাত-পা পরিষ্কার করে কাপড়চোপড় ধুয়ে ফেললাম। রান্নার প্রস্তুতির সময় মোবাইল ফোন বেজে উঠল। এখন ফোন বাজলেই বুক ছ্যাঁত করে ওঠে। ধরে দেখি আমার সদা হাস্যোজ্জ্বল বন্ধু মহিম। কথা বলে রান্না করতে গিয়ে দেখি, একটুও লবণ নেই। উপায়ান্তর না দেখে আবার বাইরে বের হই। কিন্তু মুদিদোকান বন্ধ। খালি হাতে বাসায় ফিরলাম। খেতে হলো লবণ ছাড়া চিংড়ি আর লতি। কিন্তু লবণের ঘাটতি কি আর কিছু দিয়ে মেটে?
আবারও মোবাইল ফোন বেজে উঠল। এবার মা। তাঁর কণ্ঠে চিরচেনা উদ্বেগ, ‘কখন ছুটি পাবি?’ বললাম, ‘চিন্তা কোরো না, চলে আসব কয়েক দিনের মধ্যে।’ ফোনটা রাখার পর নিঃসঙ্গতা আরও তীব্র হয়ে উঠল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি, ব্যাংকারদের অনেকে নিরাপত্তার জন্য ব্যাংক বন্ধ রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন। হয়তো ব্যাংক বন্ধ হবে। হয়তো তখন বাড়ি যাওয়া যাবে। আবার ভাবি, গণপরিবহন তো বন্ধ। যেতে পারব তো?
পৃথিবী তো আর এমন অচল থাকবে না। সব সচল আর স্বাভাবিক হয়ে আসবে। জানালার ওপাশে নারকেলগাছের পাতায় ঝিরিঝিরি বাতাস বইবে। কিন্তু এই সময়টাকেই মনে হচ্ছে দুস্তর পারাবার।

যেভাবে করোনা মোকাবিলায় সফল শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কান কোচ জানালেন কীভাবে করোনা মোকাবিলায় সফল শ্রীলঙ্কা। ছবি: প্রথম আলোশ্রীলঙ্কান কোচ জানালেন কীভাবে করোনা মোকাবিলায় সফল শ্রীলঙ্কা। ছবি: প্রথম আলোবাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৮০০ ছাড়িয়েছে, ‌দুদিন আগে খবরটা শুনেই আঁতকে উঠেছিলেন চম্পাকা রমানায়েকে। আজ আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩১-এ। গত দুই দিনে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী বেড়েছে ৪২৮ জন। এ তথ্যটা অবশ্য আর তাঁকে জানানো হয়নি। দুদিন আগে তাঁর সঙ্গে কথা বলে বোঝা যাচ্ছিল, বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি কতটা উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে চম্পাকা কেন এতটা উদ্বিগ্ন? বরং একটা বিষয় ভেবে তিনি কিছুটা স্বস্তিতেই থাকতে পারেন। তাঁর দেশ শ্রীলঙ্কা তো খুব ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে করোনার বিস্তার। এ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় আক্রান্ত ২৩৩, মারা গেছে ৭ জন। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজের দেশ ভালো অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তা থাকবেই চম্পাকার। তাঁর কর্মস্থল যে ঢাকা, নির্দিষ্ট করে বললে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে চম্পাকা বিসিবিতে কাজ করছেন হাইপারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটের বোলিং কোচ হয়ে। গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন ছুটিতে। বাড়িতে গিয়েই আটকা।

করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় অন্য দেশগুলোর মতো শ্রীলঙ্কাও লকডাউন ঘোষণা করেছে গত মাসে। প্রায় একই সময় থেকে অঘোষিত লকডাউন চলছে বাংলাদেশেও । এ সময়ে শ্রীলঙ্কা বেশ ভালোভাবে পারলেও বাংলাদেশ পারছে না করোনার বিস্তার ঠেকাতে। বরং তা বেড়েই চলেছে দিন দিন।

শ্রীলঙ্কা কীভাবে সফল হলো, কলম্বো থেকে বলছিলেন চম্পাকা, ‘জনসংখ্যা ঘনত্বে বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার একটা পার্থক্য আছে। আর শ্রীলঙ্কায় কোনো এলাকায় যদি করোনা রোগী ধরা পড়ে, পুরো এলাকা, গ্রাম লকডাউন করা হচ্ছে। কেউই বের হতে পারবে না। এরপর সেই এলাকায় প্রত্যেকের করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। আর মানুষ সরকারের নির্দেশনা ভালোভাবে মানছে। বাংলাদেশের মানুষের তুলনায় শ্রীলঙ্কানরা বোধ হয় একটু বেশিই নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এভাবেই সরকার করোনা সামাল দিচ্ছে। অন্য দেশগুলোর তুলনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই আছে বলা যায়।’

এক মাস হলো চম্পাকা গৃহবন্দী। ঘরে আটকে থাকার সময়টা তিনি পার করছেন গান শুনে, কাজ করছেন ফিটনেস নিয়ে। প্রশাসনের কাছ থেকে অবশ্য বিশেষ অনুমতি নিয়ে রেখেছেন যেন জরুরি দরকার হলে যেকোনো সময়ে বাইরে যেতে পারেন। বর্তমান কলম্বোর পরিস্থিতি নিয়ে চম্পাকা বলছিলেন, ‘কলম্বোতে কারফিউ চলছে। আমি চাইলে বের হতে পারি, সে অনুমতি নেওয়া আছে। তবে বের হচ্ছি না। যা যা দরকার, সবই ঘরে চলে আসছে। শুধু ফার্মেসি খোলা। বাকি সব বন্ধ। আমাদের খাবারের স্বল্পতা নেই।’
লকডাউনে যাওয়ার আগে বিদেশফেরতদের কঠোরভাবে কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করেছে শ্রীলঙ্কান সরকার। নিজের দেশের করোনা পরিস্থিতি বেশ ভালো থাকলেও চম্পাকার চিন্তা হচ্ছে তাঁর ছাত্রদের নিয়ে। করোনার কারণে থমকে আছে বিসিবির এইচপির কর্মসূচি। জুলাইয়ে এইচপি দলের সফর ছিল শ্রীলঙ্কায়। সেটি এখন ঝুলছে অনিশ্চয়তার সুতোয়। অসহায় কণ্ঠে চম্পাকা বলছেন, ‘এইচপিতে থাকা খেলোয়াড়দের ফিটনেসের কাজ করে যেতে বলা হয়েছে। খাবারের অভ্যাস ধরে ঠিক রাখতে বলা হয়েছে। এর বাইরে কিছুই করার নেই। দেখি কী হয় সামনের সময়টায়।’

এটিই হচ্ছে কথা, ঘন কুয়াশা ঢাকা পথ ধরে এগোতে হচ্ছে সবাইকে। সামনে কী, কারও বলার উপায় নেই।

সপ্তাহে ১ দিন খোলা থাকবে সঞ্চয় অধিদপ্তরের অফিস

ফখরুল ইসলাম, ঢাকা

আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২০, ২৩:১৭
যেসব গ্রাহক অনলাইনের মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র কিনেও মুনাফা পাচ্ছিলেন না, তাদের স্বার্থে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অফিসগুলো সীমিত পরিসরে খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশব্যাপী এই অফিস খোলা থাকবে প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১ টা পর্যন্ত।

বুধবার সঞ্চয় অধিদপ্তর এমন আদেশ জারি করে বিভাগীয় ও জেলা অফিসগুলোকে চিঠি পাঠিয়েছে। তবে যারা আগের নিয়মে কাগজে-কলমে (ম্যানুয়াল) সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন, তাদের সমস্যা থেকেই গেল। আদেশে তাদের মুনাফার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে এখন সাধারণ ছুটি চলছে। তারপরও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতাধীন সব জেলা সঞ্চয় ব্যুরো ও জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরোগুলো প্রতি বৃহস্পতিবার তিন ঘণ্টার জন্য খোলা রাখা হবে। শুধু অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বিষয়ক কাজে খোলা রাখা হবে এ অফিসগুলো।
আরও বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এর আগে ছুটি বিষয়ক যে নির্দেশনা দিয়েছে, তা অনুসরণ করে অফিসে আসা-যাওয়া করতে হবে এবং অফিসে অবস্থান করতে হবে। এ সময় তাদের সতর্কতা ও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। জাতীয় সঞ্চয়ের বিভাগীয় কার্যালয়গুলোর উপপরিচালকেরা বিষয়গুলোর তদারকি করবেন। আর দায়িত্ব পালনকালে যাতায়াতের সময় কর্মচারীদের পরিচয়পত্র ও এই আদেশের কপি সঙ্গে রাখতে হবে।
ছুটি থাকায় সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মচারীরা অফিসে আসছিলেন না, ফলে সঞ্চয়পত্রের অনেক গ্রাহক মুনাফাও পাচ্ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে মুনাফা না পাওয়ায় কষ্ট হচ্ছিল বলে অভিযোগ করে যাচ্ছিলেন গ্রাহকেরা। গত ১২ এপ্রিল রোববার এ নিয়ে প্রথম আলো অনলাইনে ‘সঞ্চয়পত্রের মুনাফা জমা হচ্ছে না গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর ছুটির মধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মচারীদের গত সোমবার ডেকে পাঠায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় সপ্তাহে এক দিন অফিস খোলা রাখার। ওই সিদ্ধান্তের আলোকে আনুষ্ঠানিক আদেশ হয় বুধবার।
জানতে চাইলে সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সামছুন্নাহার বেগম বুধবার রাতে মোবাইল ফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘'যারা অনলাইনের মাধ্যমে ২০১৯ সালের ১ জুলাইয়ের পর সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন, তাদের অনেকে মুনাফা পাচ্ছিলেন না। সপ্তাহে এক দিন অফিস রাখার সিদ্ধান্ত হওয়ায় এখন সমস্যা কেটে যাবে।’
সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকেরা মুনাফা পেয়েছেন ১৮ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। গত জানুয়ারিতে মুনাফার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। সাত মাসের গড় হিসাব বলছে, প্রতি মাসে ২ হাজার ৬১১ কোটি টাকা করে মুনাফা পান গ্রাহকেরা।
মোটা দাগে চার ধরনের সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকই দেশে বেশি। এগুলো হচ্ছে পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখা, সঞ্চয় ব্যুরো, ডাকঘর এবং নির্ধারিত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো (লিঙ্কড ব্যাংক) থেকে গ্রাহকেরা সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন।
২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে প্রতি মাসের শুরুতেই ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাবে আগের মাসের মুনাফার টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমা হয়ে আসছে। কিন্তু চলতি মার্চ মাসে গ্রাহকদের ব্যাংক হিসাবে অনেকেরই মুনাফার টাকা জমা হয়নি।
সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মচারীরা জানান, ছুটি থাকার কারণেই এই সমস্যা হয়েছে। এখন প্রত্যেক অফিসের একজন কর্মচারী হিসাব করবেন সংশ্লিষ্ট গ্রাহক কত টাকা মুনাফা পাবেন, আরেকজন কর্মচারী অনুমোদন দেবেন। এরপর তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে।
যারা ম্যনুয়ালি সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন, তাদের মুনাফার কী হবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের ডিজি সামছুন্নাহার বেগম বলেন, ‘'করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিরাপত্তার স্বার্থেই এ নিয়ে আপাতত কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। ম্যানুয়ালি যারা সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন, মুনাফা পেতে তাদের সশরীরে আমাদের অফিসে আসতেই হবে।’ অফিস স্বাভাবিকভাবে খোলার আগ পর্যন্ত এ ধরনের গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানান তিনি।

নিউইয়র্কে করোনায় বাংলাদেশী অধ্যাপিকার মৃত্যু

করোনায় মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিন বেড়েই চলেছে এমন এক শহর নিউইয়র্ক।  এবার সেখানের করোনার মৃতের সংখ্যা বাড়াল পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার এক সাবেক অধ্যপিকার মৃত্যুতে। বুধবার বাংলাদেশ সময় দুপুর তিনটার দিকে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। করোনায় মৃত ঐ অধ্যাপিকার নাম তাহেরা আক্তার। তিনি ভাঙ্গুড়া পৌর শহরের সরদারপাড়া মহল্লার সাবেক অধ্যক্ষ শাহাদত হোসেনের স্ত্রী।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপিকা তাহেরা আক্তার জাহান ও তার স্বামী সাবেক অধ্যক্ষ শাহাদাত হোসেন বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন সময বিভিন্ন সরকারি কলেজে চাকরি করেছেন। ওই দম্পতি অবসরে যাওয়ার পরে গত তিন বছর আগে আমেরিকায় চলে যান। সেখানে তারা নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করেন। সম্প্রতি তাহেরা আক্তার কিডনিজনিত রোগে ভুগছিলেন। তাই তার চিকিৎসার কারণে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে যাতায়াত করতেন।
হাসপাতলে যাতায়াতের সময় এক পর্যায়ে ওই দম্পতি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন। গত এক সপ্তাহ ধরে শহরের আরেকটি হাসপাতালে করোনা ইউনিটে দু'জনই আইসোলেশনে ছিলেন। একপর্যায়ে তাহেরা আক্তারের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে বুধবার দুপুর তিনটার (বাংলাদেশ সময়) দিকে মারা যান। এদিকে করোনায় আক্রান্ত তার স্বামী শাহাদাত হোসেন একই হাসপাতালে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে তার অবস্থা অনেকটা উন্নতির দিকে।

নিহতের ভাতিজা বিপু আহমেদ জানান, তার চাচা ও চাচী দীর্ঘ তিন বছর ধরে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে বসবাস করেন। চিকিৎসার জন্য ওই শহরের একটি হাসপাতলে যাতায়াত করার সময় তারা করোনায় আক্রান্ত হন। এতে তার চাচী মারা যান। তবে তার চাচার শারীরিক অবস্থা এখন অনেকটাই ভালো।

সৌদিতে করোনা কেড়েছে ১৫ বাংলাদেশির প্রাণ, আক্রান্তদের নিয়ে উদ্বেগ

ফাইল ছবি
সৌদি আরবে প্রাণঘাতি করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১৫ বাংলাদেশি মারা গেছেন। দেশটিতে (১৫ এপ্রিল পর্যন্ত) মোট মৃতের সংখ্যা ৭৯। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করোনা সেলে থাকা তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই প্রবাসী বাংলাদেশি করোনা আক্রান্ত রয়েছেন। আক্রান্তের বিচারে পারস্য উপসাগরীয় রাষ্ট্র কাতার এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশিদের মৃত্যুহার সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি। এক সপ্তাহ আগে সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মূখপাত্রের এক ব্রিফিংয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ন্যাশনালিটির প্রসঙ্গে বলা হয়- করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত ব্যক্তিদের বেশিরভাই নন-সাউদি। তারা কর্মসূত্রে সৌদি আরবে থাকলে মূলত অন্য দেশের নাগরিক। দআক্রান্তদের মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ সৌদি আরবের বাইরে নাগরিক এমনটা জানিয়ে ঢাকায় পাঠানো রিয়াদ মিশনের রিপোর্ট বলছে, সরকারী সূত্রে এক সপ্তাহ আগে ৮২ বাংলাদেশি আক্রান্ত বলে তাদের জানানো হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ কমিউনিটি সূত্রে য খবরা খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে এই সংখ্যা আরেকটু বেশি বলে ধারণা মিলেছে।
দেশটিতে আক্রান্ত বাংলাদেশিদের বেশিরভাগই ডরমিটরিতে থাকেন জানিয়ে ঢাকার করোনা সেলে কাজ করা এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, ডরমিটরিতে এক রুমে ৭-৮জন পর্যন্ত থাকেন। ফলে একজন আক্রান্ত হলে অন্যদেরও ঝুঁকি বাড়ে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ কমিউনিটির বরাতে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ মিশনের ঢাকায় পাঠানো রিপোর্টে বলা হয়েছে, আক্রান্তের যে সংখ্যা (৮২) পাওয়া গেছে তা প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন নয়। প্রকৃত অর্থে আক্রান্তে সংখ্যা আরেকটু বেশি হবে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে- আক্রান্তের বিষয়ে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য মতে, ৭২ জন পুরুষ আর ১০ জন নারী। বেশিরভাগ অর্থাৎ ২৭ জনের বাস রিয়াদে। অন্যরা দাম্মাম, মদীনা, আল কাসিম, তাবুক জেদ্দাসহ বিভিন্ন এলাকায়। করোনা ভয়াবহতা রোধে সৌদি আরবের বাদশাহ দেশটিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ ঘোষণা করেছেন। পবিত্র দুই মসজিদ মক্কা ও মদীনাসহ সর্বত্র জমায়েত বন্ধ রয়েছে। বৈশ্বিক ওই সঙ্কটের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় সৌদি সরকার জেলে থাকা বিদেশি এবং ওমরাহ করতে যেতে আটকা বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিজ নিজ দেশে ফেরতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ৩৬৬ বাংলাদেশিকে নিজ খরচে স্পেশাল বিমান দিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকায় পৌঁছে দিয়েছে সৌদি সরকার। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, করোনার প্রভাবে দেশটিতে থাকা প্রবাসীরা নানারকম ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবৈধ এবং নানা অপরাধে আটক একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে ফিরতে বাধ্য হতে পারে।

কিছু বাংলাদেশ এরইমধ্যে বেকার হয়ে পড়েছেন, তাদের ত্রাণ দিচ্ছে মিশন: এদিকে সৌদি আরবে এরইমধ্যে কিছু বাংলাদেশি কর্মহীন হয়ে অর্থ ও খাবারের কষ্টে পড়ে গেছেন।  রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে সেই সব অভিবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে খাদ্য বিতরণ শুরু হয়েছে। করোনার কারণে গত ২৩ মার্চ থেকে চলমান কারফিউতে বাংলাদেশীদের অনেকেই অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছেন জানিয়ে দূতাবাসের রিপোর্টে বলা হয়- বাংলাদেশ সরকারের সহায়তার অংশ হিসেবে দূতাবাস সঙ্কটে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ফুড বাস্কেট বিতরণ কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই বিতরণ কার্যক্রমে কমিউনিটির সঙ্গে মিলে তৈরি করা তালিকা ধরে প্রত্যেককে ৫ কেজি চাল, ২ কেজি আলু, ২ কেজি পেঁয়াজ, ১ কেজি ডাল, ১.৫ লিটার তেল, লবন ও সাবান দেয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, করোনা পরিস্থিতিতে যেন কোন বাংলাদেশী অভিবাসী চাকুরিচ্যুত না হন এজন্য বিভিন্ন কোম্পানির সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে দূতাবাস। তারপরও  কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি যদি খাদ্য সঙ্কটে পড়েন বা  বেতন ভাতা থেকে বঞ্চিত হন তাদের জরুরি ভিত্তিতে দূতাবাসের ইমেইল অথবা হোয়াটস আ্যপে তথ্য প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে। দূতাবাসের সরবরাহ করা তথ্য মতে, কেবল রিয়াদ নয়, জেদ্দাসহ সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলেও খাদ্যকষ্টে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝেও খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।  জেদ্দায় বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ফয়সল আহমেদ এবং তাঁর সহকর্মীরা ওই অঞ্চলের সহায়তা কার্যক্রম দেখভাল করছেন।

উৎকণ্ঠা নিয়ে হাওরে ধান কাটা শুরু করোনা ও অকাল বন্যার শঙ্কা শ্রমিকেরও সংকট

উৎকণ্ঠা নিয়ে হাওরে ধান কাটা শুরু
করোনা ও অকাল বন্যার শঙ্কা নিয়ে হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের দিরাই, শাল্লা, ধর্মপাশা ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এসব এলাকার সংসদ সদস্য, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও কৃষক ও শ্রমিকদের উৎসাহ জোগাচ্ছেন ধান কাটতে।
অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর : কিশোরগঞ্জ :কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী- এ চার উপজেলা নিয়ে গঠিত জেলার মূল হাওরাঞ্চল। ইতোমধ্যে হাওরে শুরু হয়েছে বোরো ধান কাটা। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবে ধান কাটার শ্রমিক না আসায় বিপাকে পড়েছেন হাওরের কৃষক। এ অবস্থায় কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনের এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক নিয়েছেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি নিজেই হাওরে গিয়ে ধান কাটছেন। নিজ সংসদীয় আসনের মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে গিয়ে শুরু করেছেন ধান কাটা। তার এ কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে হাওরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও কৃষকের ধান কেটে দিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে এমপির নেতৃত্বে বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ২৫০ একর জমির ধান কাটা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে অষ্টগ্রামে হাওরে ধান কেটে উপজেলায় এ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন এমপি তৌফিক। তার আহ্বানে এলাকার ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সাত দিন ধরে ধান কাটছেন। বৈশাখ মাসজুড়ে চলবে এ কর্মসূচি। এতে উপস্থিত ছিলেন অষ্টগ্রাম উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা শেখ তারিফ আহাম্মেদ, যুবলীগ নেতা মেহেদী হাসান কাঞ্চন, বঙ্গবন্ধু আইন ছাত্র পরিষদের জেলার সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ প্রমুখ।

সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক বলেন, হাওরে ছাত্রলীগ-যুবলীগ এবার নজির সৃষ্টি করবে।

সুনামগঞ্জ :হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এবার ধান কাটতে কৃষক-শ্রমিকের পাশাপাশি হাজারো শিক্ষার্থী নেমেছেন ধান কাটতে। ভয় কাটিয়ে পাকা ধান ঘরে আনার যুদ্ধে নেমেছেন লাখো মানুষ। জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার হাওরে এবার বোরোর আবাদ হয়েছে দুই লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ লাখ টন। দিরাই উপজেলার রাজাপুর গ্রামের কৃষক আবদুস ছাত্তার জানান, মঙ্গলবার থেকে ধান কাটা শুরু করেছেন। অন্যান্য বছর শ্রমিকরা গৃহস্থের বাড়িতেই থাকতেন। এবার করোনার ভয়ে গ্রামের পাশেই তাদের থাকার জন্য প্যান্ডেল করা হয়েছে। রাজাপুর গ্রামের কৃষক কফিল উদ্দিন জানান, ধান কাটা শ্রমিকের সংকট রয়েছে তাদের এলাকায়। অনেকে করোনার ভয়ে আসছেন না ধান কাটতে। শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান আলামিন চৌধুরী জানান, গার্মেন্ট শ্রমিক এবং শিক্ষার্থীরাও ধান কাটতে নেমে গেছেন। তবে ভয় হচ্ছে অকাল বন্যার। শিক্ষার্থী দীপজয় গোপ বলেন, শিক্ষার্থীরা মিলে এই উপজেলায় একাধিক গ্রুপ ধান কাটার কাজে নেমেছে। যেসব কৃষক শ্রমিক সংকটে ভুগছেন, তাদের ধান কেটে দিচ্ছেন এবং কম পারিশ্রমিক নিচ্ছেন তারা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক সফর উদ্দিন জানান, আবহাওয়া দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে ১৭ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ২২০ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় ধানে ৮০ ভাগ চাল হলেই কেটে আনতে হবে। এবারও বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক আনতে যোগাযোগ করা হয়েছে। স্ব স্ব উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার কাছ থেকে সনদ নিয়ে ইতোমধ্যে তিন হাজার ২০০ শ্রমিক এসেছেন। আরও ১২ হাজার ২৯৪ শ্রমিক আসবেন। সিলেট আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ আবু সাঈদ চৌধুরী জানান, এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ বলেন, ঝড়-বৃষ্টি ও অকাল বন্যার শঙ্কা রয়েছে। এ জন্য দ্রুত ধান কাটতে হবে।

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) :উপজেলায় মঙ্গলবার বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কায় পাকা ধান আগেভাগেই কাটা শুরু হয়েছে। এ জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও প্রচার চালানো হচ্ছে। গত মঙ্গলবার ধান কাটায় কৃষকদের সঙ্গে অংশ নেন উপজেলা চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদ, ইউএনও শামীম আল ইমরান, ওসি ইয়াছিনুল হক প্রমুখ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবল সরকার বলেন, 'বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকদের পেকে যাওয়া ধান দ্রুত কাটার আহ্বান জানাচ্ছি। এখানে শ্রমিকের সংকট হবে না। উপজেলা প্রশাসন থেকে কৃষি শ্রমিকদের ত্রাণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য অনেকেই ধান কাটায় আগ্রহী হবেন।

ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) :ধর্মপাশায় হাওরে বোরোর বাম্পার ফলন হলেও করোনার কারণে উজান থেকে আসছেন না শ্রমিক। যেসব স্থানীয় শ্রমিক ধান কাটতে রাজি হচ্ছেন, তাদের মজুরিও বেশি। বিচরাকান্দা গ্রামের কৃষক আহম্মদ আলী জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে উজানের শ্রমিকরা আসতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। ফলে স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম বলেন, আগাম বন্যার আশঙ্কায় কৃষককে দ্রুত ধান কাটতে বলা হয়েছে। ইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) আবু তালেব বলেন, 'অন্য এলাকা থেকে যেসব শ্রমিক আসবেন তাদের আলাদা রাখার জন্য কৃষকদের বলা হয়েছে।

কী শিক্ষা দিচ্ছে করোনা

কী শিক্ষা দিচ্ছে করোনা
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস যেন প্রকৃতির হয়ে মানুষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে। ওলটপালট করে দিয়েছে গোটা বিশ্ব। এটাই বোধ হয় প্রকৃতির প্রতিশোধ। আমরা মানুষ এতদিন নির্বিচারে প্রকৃতির ওপর ধ্বংসলীলা চালিয়েছি; আকাশ-বাতাস বিষময় করেছি; নদনদী দূষণ করেছি। সবই আমরা করেছি সভ্যতার অগ্রগতির নামে; আমাদের ভোগবিলাসের উপকরণ জোগাতে। কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করেছি, বড় বড় পরিকল্পনা করেছি; কাজের কাজ হয়নি কিছুই। সর্বংসহা ধরিত্রী এবার গর্জে উঠে দেখিয়ে দিচ্ছে- এ বিপুলা পৃথিবীতে মানুষ কত অসহায়!
সারা পৃথিবী আজ অবরুদ্ধ। এক দেশ থেকে আরেক দেশ দূরে থাক, নিজ দেশেও আমরা চলাচল করতে পারছি না। সবাই ঘরে বন্দি। করোনার এটাই সংক্রমণ প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠ পন্থা। যেহেতু প্রতিদিনের প্রচণ্ড ব্যস্ততা শিকেয় তুলে এখন আমরা বাড়িতে বসে আছি; একবার ভেবে দেখি, এই করোনা আমাদের কী শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে?
যদিও জানি, ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে- ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা না নেওয়া। তবু একদিন যখন করোনার কাল কেটে যাবে, আমরা নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করব, তখন কি আমরা মনে রাখব কিছু কথা?
এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার কেবল মানুষের একার নয়। পশু-পাখি, জীব-জন্তু, নদী-বন- সবারই সমান অধিকার আছে এ পৃথিবীতে থাকার। আমরা আমাদের ভোগ-লালসার জন্য এসব ধ্বংস করতে পারি না। বর্তমান সময় বলে দিচ্ছে, কী করলে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমে। প্রকৃতির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেই আমাদের বাঁচতে হবে। আকাশ কি কখনও এত নীল দেখেছি আমরা? অথবা নদীর পানি এত স্বচ্ছ কিংবা বাতাস এত বিষমুক্ত?
দৈনন্দিন জীবনাচরণে এখন আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হচ্ছে। বারবার হাত ধুয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হচ্ছে। সুস্থ জীবনের জন্য, রোগ-বালাই থেকে দূরে থাকার জন্য এসব অভ্যাস কি আমরা স্বাভাবিক সময়ে বজায় রাখতে পারি না?
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ বিপদের সময়ে একে অন্যকে সাহায্য করে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিনে, দাঙ্গা বা দুর্ভিক্ষের কালে অসহায় মানুষকে সহায়তা করতে মানুষের অভাব হয়নি। এবারও আমরা দেখছি খেটে খাওয়া মানুষ, যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের খাদ্য সহায়তা দিতে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিরা এগিয়ে এসেছেন। স্বাভাবিক সময়ে আমরা কি পারি না, আমাদের চারপাশের দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে? নিজে একা সমৃদ্ধির মধ্যে বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো আনন্দ আছে? কোনো তৃপ্তি আছে?
এখন আমরা পুরো সময়টাই পরিবারের সঙ্গে কাটাচ্ছি। নানা কাজের অজুহাতে আমরা পরিবারের সঙ্গে, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর সময় কতটা কমিয়ে ফেলেছিলাম! নতুন জীবনে কি আমরা নিয়ম করে ঘরে সবাই মিলে সময় কাটাব না?
এখন উপলব্ধি করি, স্বাভাবিক জীবনে আমরা অনেক কিছুই না করলেও পারি। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে বাইরে ঘোরাঘুরি। তেমন প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোর অভ্যাস যদি আয়ত্ত করতে পারি, তবে যানবাহনের ব্যবহার কম হবে; পরিবেশ দূষিত হবে না। ঘরে বসে লেখাপড়া করতে পারব, গান শুনতে পারব, কত কাজ গোছাতে পারব!
সাম্প্রতিক একটা অমানবিক ঘটনায় বিপর্যস্ত বোধ করেছি। পোশাক শিল্পের মালিকরা কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে হাজার হাজার কর্মীকে ঢাকা নিয়ে এলেন। চাকরি বাঁচাতে তারা হেঁটে, চরম কষ্ট করে এসে দেখলেন, কারখানার গেট বন্ধ। আরও কয়েকদিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ আচরণের দায় কে নেবে? কোনো সমন্বয় ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো? ওই দিন কি তাদের পাওনা বেতন দেওয়া যেত না?
এবার প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতি চালু রাখার জন্য যে প্যাকেজগুলো ঘোষণা করেছেন, তা অত্যন্ত সুবিবেচনাপ্রসূত। সেখানেও কিন্তু সবেচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন পোশাক শিল্প মালিকরা। এ প্যাকেজের টাকা যেন কেবল কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য ব্যবহূত হয়- তার জন্য কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রাখতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত বলে পোশাক শিল্প মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে।
আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি যে কৃষি- তাকে বাঁচাতে হবে। কৃষক বাঁচলে আমরা বাঁচব- এটা যেন আমরা ভুলে না যাই। গ্রামের লাখ লাখ কৃষক ও হাঁস-মুরগি-মাছের খামারিরাও সরকারের বিশেষ প্রণোদনা পাবে জেনে স্বস্তিবোধ করছি। সেদিন একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ লিখেছেন, সরকারের নানা প্রণোদনা থেকে ধনীরাই আরও লাভবান হবে। এটা যেন মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এখনকার সংকটময় সময়ের নায়করা হলেন আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সেবা করে চলেছেন। এদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার সীমা নেই।
এর মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি নতুন বছরে। আমরা নিশ্চিত- এ কৃষ্ণপক্ষের অবসান হবেই। ১৪২৭ আমাদের উপহার দেবে নতুন এক পৃথিবী। আমাদের কামনা -অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
নাট্যব্যক্তিত্ব

নতুন বিপদ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে গোপনে ফিরছে মানুষ

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে গোপনে ফিরছে মানুষ
লকডাউনের নিষেধ মানছে না অনেকেই। পণ্যবাহী ট্রলারে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে দলে দলে বাড়ি ফিরছে মানুষ। পটুয়াখালীর ছবি- মুফতী সালাহউদ্দিন
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গার্মেন্টস ও শিল্প-কারখানায় কর্মরত শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ নিয়ম ভেঙে গোপনে দল বেঁধে বিভিন্ন জেলায় নিজ বাড়ি ফিরছেন। গত কয়েক দিন তাদের বাড়ি ফেরার ঘটনায় এলাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয়দের মাঝে।
সমকালের অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- কিশোরগঞ্জ :গত সোমবার গভীর রাতে কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম এলাকায় একটি পিকআপ ভর্তি মানুষ বাড়ি ফেরে। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদের কাছে এত রাতে কোথা থেকে এসেছে জানতে চাইলে তারা সঠিক তথ্য না দিয়ে কয়েকজনকে নামিয়ে দিয়ে অন্যদের নিয়ে দ্রুত চলে যায়। একইভাবে নদী ও সড়কপথে করিমগঞ্জ, বালিখলা, বাজিতপুর, নিকলী হয়ে অনেক শ্রমিক হাওরাঞ্চলে প্রবেশ করে নিজ নিজ গ্রামে ঢুকছে।

কটিয়াদী হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবদুস সোবহান বলেন, পুলিশ কঠোরভাবে মহাসড়ক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এ ধরনের ঘটনা নজরে এলে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আক্রান্ত এলাকা থেকে এভাবে মানুষ  এলে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হতে পারে বলে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) জেলা সভাপতি ডা. দীন মোহাম্মদসহ স্থানীয় কয়েক চিকিৎসক জানান।

পটুয়াখালী :গত ৪ এপ্রিল থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে সড়ক ও নদীপথে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ আসে পটুয়াখালী সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। স্থানীয় প্রশাসন এসব লোককে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দিলেও কেউ তা মানছে না। এমনকি তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেও চলাচল করছে না। ফলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে পটুয়াখালীর মানুষ। গত ৯ এপ্রিল দুমকীতে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা এক গার্মেন্টস কর্মীর মৃত্যু ও তার বড় বোন করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাংগীর আলম জানান, যারা অন্য জেলা থেকে আসছে তাদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রাখার বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

লক্ষ্মীপুর :গত এক সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জ থেকে শতাধিক ব্যক্তি লক্ষ্মীপুরে এসেছে। এর মধ্যে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ প্রায় ৫০ জনকে খুঁজে বের করে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে। অন্যরা আত্মগোপনে আছে। এর মধ্যে অনেকেই পাড়া-মহল্লা, হাটবাজারে অবাধে বিচরণ করছে। এতে আতঙ্ক বাড়ছে জেলাব্যাপী। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে রামগঞ্জ ও ঢাকা থেকে রামগতিতে আসা করোনায় আক্রান্ত দুইজন শনাক্ত হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স, পণ্যবাহী গাড়ি ও ট্রলারযোগে কৌশলে তারা আসে।

মাগুরা :গত ৪-৫ দিনে নারায়ণগঞ্জ থেকে কয়েকশ' মানুষ মাগুরার বিভিন্ন স্থানে ঢুকেছে। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। জেলা সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, মাঠ পর্যায়ে কর্মী নামিয়ে তাদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। এ পর্যন্ত জেলায় বিদেশফেরত ৪০০ জনের কোয়ারেইটাইন শেষ হয়েছে। এখন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ৬৭৯ জনকে কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে।

কাশিয়ানী (গোপালগঞ্জ) :নারায়ণগঞ্জ থেকে শ্রমজীবীদের আসা কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছে না। এতে কাশিয়ানী উপজেলায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন স্থানীয়রা। মোড়ে মোড়ে পুলিশের চেকপোস্ট থাকলেও গ্রামের বিকল্প রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করেছে তারা। ইউএনও সাব্বির আহমেদ বলেন, বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিদের ঘরে থাকতে বলছি। কেউ কোয়ারেন্টাইন অমান্য করলে সাজা দেওয়া হচ্ছে।

পটিয়া (চট্টগ্রাম) :ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে অন্তত দেড় শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা এসেছেন পটিয়ায় নিজ বাড়িতে। এদের অনেকের এলাকায় আসার খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে হোম কোয়ারেন্টাইনে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও বেশিরভাগই সে নিয়ম মানছে না। ইউএনও ফারহানা জাহান উপমা বলেন, ব্যাংকারদের অনেকেই বাইরে ঘোরাঘুরি করছে বলে অভিযোগ পাচ্ছি। কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়েছে।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ) :ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে গার্মেন্টস ও কল-কারখানার শ্রমিকরা গোপনে বাড়িতে এসে লুকিয়ে থাকলেও এদের পরিবারের লোকজন এলাকার মানুষদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করায় এলাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। ইতোমধ্যে উপজেলায় একজনের দেহে করোনার সংক্রমণ পাওয়া গেছে। ইউএনও এএফএম ফিরোজ মাহমুদ জানান, কেউ হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্রিটেনে করোনাভাইরাসে আরও ৪ বাংলাদেশির মৃত্যু

ব্রিটেনে করোনাভাইরাসে আরও ৪ বাংলাদেশির মৃত্যু
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। ১৫ এপ্রিল (বুধবার) দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্যোশাল মিডিয়ায় তাদের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করেছেন তাদের স্বজনরা। তারপরও অনেকেরই খবর আসছে না সংবাদ মাধ্যমে। বিশেষ করে নারীদের।
সরকারি সূত্রে সঠিক কোনও পরিসংখ্যান প্রকাশিত না হলেও স্যোশাল মিডিয়ার পরিসংখ্যানেও রয়েছে মতভেদ। করোনায় মৃতদের তালিকা করারও চেষ্টা করছেন সংবাদকর্মীরা। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৯৪ জন বাংলাদেশি এই মহামারীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারীরা হচ্ছে:-
আব্দুন নূর
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন পূর্ব লন্ডনের ইস্টহামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আব্দুন নূর। তিনি গত ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে নিউহাম হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৬২ বছর। তিনি স্ত্রী, ৪ ছেলে ১ মেয়ে রেখে গেছেন। তিনি জগন্নাথপুর বৃটিশ বাংলা এডুকেশন ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তার দেশের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার, জগন্নাথপুর পৌরসভার হাবিবুর গ্রামে। হাবিবুর রহমান
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের বো এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। তিনি গত ১৪ এপ্রিল মঙ্গরবার বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটের সময় লন্ডন হমাটন হসপিটালে ইন্তেকাল করেন। তিনি গ্রেটার সিলেট কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তার দেশের বাড়ি সিলেটের ওসমানী নগর উপজেলার, সাদিপুর ইউনিয়নের সাদিপুর গ্রামে।
সুরুজ আলী
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মৃত্যুবরণ করেছেন নিউহামের বাসিন্দা সুরুজ আলী। তিনি ১৫ এপ্রিল বুধবার সকালে হমাটন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর। তিনি স্ত্রী ২ ছেলে ২ মেয়ে রেখে গেছেন। তার দেশের বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার সাবাজপুর গ্রামে।
শফিকুল ইসলাম
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইংল্যান্ডের কেন্টে মৃত্যুবরণ করেছেন শফিকুল ইসলাম নামের এক ইতালিয়ান বাংলাদেশি। তিনি গত ১২ এপ্রিল রবিবার স্থানীয় একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ইউকের সাধারণ সম্পাদক জলিল খান জানিয়েছেন, তিনি গত ৪ বছর যাবত কেন্টের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। তার দেশের বাড়ি নারায়নগঞ্জ জেলায়। যুক্তরাজ্যে তার কোনও নিকট আত্মীয় স্বজন নেই বলে জানিয়েছেন জলিল খান। তবে দেশে মৃত শফিকুল ইসলামের স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মরহুমের জানাজা ও দাফন রেস্টুরেন্ট মালিক করছেন বলে জানাগেছে। তবে ওই রেস্টুরেন্টের মালিক তার নাম প্রকাশ করেননি।
বিডি প্রতিদিন/কালাম

নভেল করোনাভাইরাস মহামারীতে বিমান চলাচলে অচলাবস্থার মধ্যে সৌদি আরব থেকে তিন শতাধিক বাংলাদেশি ঢাকায় ফিরেছেন।


মা, বাবার কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত ডা. মঈন

করোনায় আক্রান্ত হলে ৫, মৃত্যু হলে ৫০ লাখ টাকা পাবেন ব্যাংকাররা

বাংলাদেশ ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি
সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেও ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন ব্যাংকাররা। নিজের জীবন এবং পরিবারকে ঝুঁকিতে রেখে দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশেষ স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা এবং বিশেষ অনুদান প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বুধবার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যেও যেসব ব্যাংক কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন তাদের মধ্যে কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে পদমর্যাদার ভিত্তিতে তাদেরকে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে সে অর্থ পরিশোধ করবে ব্যাংক। পাশাপাশি তার সার্বিক চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে।
সাধারণ ছুটির সময় দায়িত্ব পালনের কারণে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা কর্মচারীর মৃত্যু ঘটলে বিশেষ স্বাস্থ্য বীমার জন্য নির্ধারিত অংকের পাঁচগুণ বিশেষ অনুদান হিসেবে তার পরিবারকে প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক তার অন্য কোনো দায়-দেনার সঙ্গে বিশেষ অনুদান সমন্বয় করতে পারবে না।
এছাড়া ব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ সুবিধা যথানিয়মে প্রদান করতে হবে। সাধারণ ছুটিকালীন সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের সময় কিংবা দায়িত্ব পালনের সময় অন্য যে কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে তার চিকিৎসা প্রকৃত ব্যয় বহন করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
এই নির্দেশনা সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির তারিখ থেকে কার্যকর হবে এবং সাধারণ ছুটির শেষ হওয়ার পরবর্তী এক মাস পর্যন্ত আক্রান্তদের বিশেষ স্বাস্থ্য বীমা কার্যকর থাকবে।
এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য ঝুঁকি ভাতা ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাধারণ ছুটির মধ্যে এক মাসে কেউ ১০ দিন অফিস করলে মাসিক মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ বোনাস হিসাবে পাবেন।

করোনায় ভিডিওকলে চিকিৎসা দিতে এলো ‘হ্যালো ডক’

ছবি সংগৃহীত
ছবি সংগৃহীত
দেশে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করেছে ভার্চুয়াল হাসপাতাল ‘হ্যালো ডক’। রোগীরা ঘরে বসেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। করোনা রোগের ক্রান্তিলগ্নে এই সেবাটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেয়া হবে।
করোনাভাইরাসের দ্রুত সংক্রমণের কারণে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের জন্য এই হাসপাতাল চালু হওয়ার খবর সত্যিই সুসংবাদ।
মঙ্গলবার অনলাইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হ্যালো ডকের উদ্বোধন করা হয়েছে। উদ্বোধন করেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। যেখানে বলা হয়েছে, প্ল্যাটফর্মটিতে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা অনলাইন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন।
উদ্যোক্তারা বলছেন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ডাক্তারদের ৮০ শতাংশ সেবাই ঘরে বসে অনলাইন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রদান করা সম্ভব। এ ছাড়া এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে অবস্থান করে রক্ত পরীক্ষা সেবা ও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা গ্রহণ করা যাবে।
দেশের প্রথম লাইফস্টাইল অ্যাপ ‘কথা’-এর সঙ্গে মিলে এই ভার্চুয়াল হাসপাতালটি তৈরি করেছে আমার ল্যাব এবং অ্যারগো ভেনচারস লিমিটেড নামে অপর দুটি কোম্পানি।
প্রাথমিকভাবে আমার ল্যাবের ফেসবুক পেজ এবং কথা অ্যাপ থেকে হ্যালো ডকের সেবা নেয়া যাবে।
সেবা গ্রহণ অত্যন্ত সহজ ও সেবা গ্রহণ করার জন্য নতুন কোনো অ্যাপ বা সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে হবে না। একজন রোগী ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের স্মার্ট চ্যাট বটের মাধ্যমে সেবাটি গ্রহণ করতে পারবেন।

Tuesday, April 14, 2020

করোনা ছড়িয়ে পড়েছে ৩৭ জেলায়

করোনা ছড়িয়ে পড়েছে ৩৭ জেলায়
করোনা ভাইরাসের প্রতীকি ছবি।
বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের থাবায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও থমকে গেছে। দিন দিন বেড়েই চলেছে করোনায় নতুন নতুন সংক্রমনের সংখ্যা। তবে অদৃশ্য এ ভাইরাসের মোকাবেলায় গত ২৫ মার্চ থেকে আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জেলাও লকডাউন ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয়ের নিয়মিত বিফ্রিংয়ে ১৪ এপ্রিল এ গত ২৪ ঘন্টায় ২০৯ জন নতুন করোনায় আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। আর এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ দিন মৃত্যু বরণ করেন ৭ জন।
এখন পর্যন্ত ৩৭ জেলায় করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে আইইডিসিআর। তালিকার তথ্য মতে ১৩ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত ঢাকা বিভাগের ঢাকা শহরেই ৩৮৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা অন্যান্য জেলাগুলোতে আরো ২৯১ জন করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে। যারমধ্যে গাজীপুরে ৩৫ জন, কিশোরগঞ্জে ১০ জন, মাদারীপুরে ১৯ জন, মানিকগঞ্জে ৫ জন, নারায়ণগঞ্জে ১৪৪ জন, মুন্সীগঞ্জে ১৭ জন, নরসিংদীতে ২০ জন, রাজবাড়ীতে ৬ জন, টাঙ্গাইলে ৭ জন, শরীয়তপুরে ১ জন, গোপালগঞ্জে ৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রামে ১৮ জন, কক্সবাজারে একজন, কুমিল্লায় ৯ জন, ব্রাহ্মনবাড়িয়া ৬ জন, লক্ষীপুরে একজন, চাঁদপুরে ৬ জন।
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জে ও সিলেট জেলায় একজন করে করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে।
রংপুর বিভাগের রংপুরে ২ জন, গাইবান্ধায় ৬ জন, নীলফামারীতে ৩ জন, লালমনিরহাটে একজন ও ঠাকুরগাঁয়ে ৩ জন।
খুলনা বিভাগের চুয়াডাঙ্গা জেলায় এ দিন এক জন করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ জেলায় ৫ জন, জামালপুরে ৬ জন, নেত্রকোনায় একজন ও শেরপুরে ২ জন।
বরিশাল বিভাগের বরগুনায় ৩ জন, বরিশালে ২ জন, পটুয়াখালীতে ২ ও ঝালকাঠিতে ৩ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে।
দেশে সর্বোচ্চ সংখ্যক করোনা ভাইরাস সংক্রমিত রোগী ঢাকা শহরে ৩৮৩ জন। এই শহরের ৮৫টি এলাকায় কোভিড-১৯-এর রোগী পাওয়া গেছে।

ইউপি সদস্যকে গ্রেপ্তার করল দুদক

লকডাউন কোন দেশ কীভাবে তুলছে




দায়িত্ব নিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ: কোভিড-১৯ আক্রান্ত চিকিৎসক

Monday, April 13, 2020

করোনার নমুনা সংগ্রহে সারা দেশে বসছে ৩২০টি বুথ!




করোনার নমুনা সংগ্রহে সারা দেশে বসছে ৩২০টি বুথ!


দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহে ৪৪টি কিয়স্ক বসেছে বাংলাদেশে।
বেসরকারি সংস্থা জেকোজি হেলথ কেয়ারের দারুণ একটি উদ্যোগ। ভয়ংকর করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিমাণ যেমন কমবে, তেমনি পরীক্ষার পরিমাণও কয়েকগুন বেড়ে যাবে। যত বেশি পরীক্ষা ততো বেশি ঘরবন্দি এবং কমবে সংক্রমণের হার।
জানা গেছে, ৪৪টি বুথের মধ্যে ৮টি ঢাকায়, নারায়ণগঞ্জে ৮টি এবং বাকি বুথগুলো দেশের অন্যান্য বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে।
দেশজুড়ে পর্যায়ক্রমে ৩২০টি বুথ স্থাপন করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বুড়িগঙ্গার দূষণ কমেছে!‌‌

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০২:৪৭ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২০
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে প্রবেশের প্রতিটি গেটেই তালা ঝুলছে। দু-চারজন ভবঘুরে এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে আছে। একটি গেট খোলা দেখে প্রবেশ করতে যেতেই পথ আগলে দাঁড়ালেন একজন আনসার সদস্য। পরিচয় দেয়ার পর ‘একটু দাঁড়ান’ বলে ভেতরে কারও সাথে কথা বলতে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, ‘দুঃখিত, কিছু মনে করবেন না, বন্দর পরিচালকের অনুমতি ছাড়া টার্মিনালে প্রবেশ করা যাবে না।’ এ কথা বলে মোবাইল নম্বর দিলেন। বন্দর পরিচালক অবশ্য গণমাধ্যমকর্মী শুনে মোবাইল ফোনে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন।
বাইরে থেকে আঁচ করতে পারলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হলো এ যেন অচেনা এক সদরঘাট। চিরায়িত সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের সামনের রাস্তায় দিনভর যানজট, পরিবার-পরিজন, বাক্সপেটরা নিয়ে হাজার হাজার যাত্রীর লঞ্চঘাট অভিমুখে অবিরাম পদচারণা, ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের ফল বিক্রেতাদের উচ্চস্বরে হাঁকডাক, কুলিদের ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি, ছোটবড় জাহাজ ও লঞ্চের বিকট শব্দে সাইরেন সবকিছু যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে।
Burigonga
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগ করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সদরঘাট থেকে সারাদেশে নৌপথে চলাচল বন্ধ থাকায় সদরঘাট এখন জনমানবশূন্য মৃতপ্রায় এক টার্মিনাল।
Burigonga
টার্মিনাল থেকে ঢালু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই সবুজ তরতাজা কয়েকটি বেগুনীরংয়ের ফুলসমেত কচুরিপানা ভাসার দৃশ্য চোখে পড়ল। বিশাল টার্মিনালে কোনো জাহাজ কিংবা লঞ্চ নেই। চারদিকে ধু ধু শূন্যতা। টার্মিনালের বিপরীতে দক্ষিণ পাড়ে হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ নোঙর করে আছে। করোনার কারণে সরকারিভাবে অত্যাবশ্যক প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ থাকায় সদরঘাট টার্মিনালের বিপরীত দিকে কেরানীগঞ্জের রাস্তাঘাটও জনমানবশূন্য।
Burigonga
স্বাভাবিক সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি আলকাতরার রংয়ের মতো কালো দেখালেও সে তুলনায় পানিটা কিছুটা স্বচ্ছ মনে হলো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউয়ে পানি বয়ে চলেছে। সাথে কচুরিপানাও ভেসে যেতে দেখা যায়। করোনা জনজীবন স্থবির করে দিলেও বুড়িগঙ্গা নদীকে নবযৌবন ফিরিয়ে দিচ্ছে।
Burigonga
কিছুদিন আগেও ময়লা পানির দুর্গন্ধে টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা দায় হলেও নাকে দুর্গন্ধ অনেকটা কম লাগল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও বুড়িগঙ্গা নদীতে কোনো যান চোখে পড়েনি। হঠাৎ করে সেনাবাহিনীর স্পিড বোটের টহল দেখা গেল।
শান্ত বুড়িগঙ্গা অচেনা এক নদী দেখে ফিরে আসার সময় সেই আনসার সদস্য বললেন, ‘করোনার কারণে মানুষের অশান্তি অইলেও বুড়িগঙ্গা নদীর শান্তি অইছে।’
এমইউ/বিএ/পিআর

পুলিশের অভিনব উদ্যোগ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করবে ড্রোন

সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করবে ড্রোন
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত, অহেতুক ঘোরাঘুরি এবং আড্ডাবাজি রোধ করতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)’র কোতোয়ালী থানা। থানা এলাকার মানুষজনের উপর নজরদারি বৃদ্ধি করতে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে এ ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ইদানিং দেখা হচ্ছে রাস্তাঘাটে লোকজন অহেতুক ঘোরাফেরা ও আড্ডাবাজি করতে। এতে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না। তাই কোতোয়ালী এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ছবি ও ভিডিও ফুটেজ থেকে ভালোভাবেই আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কোতোয়ালী থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে এবং লোকজনকে অহেতুক বাইরে ঘুরাফেরার না করতে সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনে আইন প্রয়োগের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে সেই নির্দেশনা অমান্য করছে কিছু লোকজন। আইন অমান্যকারী এসব লোকজনের উপর নজরদারি বৃদ্ধি করতে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সিএমপি’র কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন।
রবিবার বিকাল থেকে নগরীর কোতোয়ালি থানা এলাকার জামালখান, কাজীর দেউরি, ব্যাটারি গলি, পাথরঘাটা,  আলকরণ এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ড্রোন উড়ানো হয়। ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও করা হয়। এসব ফুটেজ যাচাই বাছাই শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।
বিডি প্রতিদিন/আরাফাত

জীবন বাঁচানো বড়, না জীবিকা বড়?

ফাইল ছবিফাইল ছবিবাংলাদেশে যখন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার সারা দেশে প্রথম কড়াকড়িভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জনসাধারণকে আহ্বান জানাল, তখন প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন (এপ্রিল ৪) আমাকে খুব নাড়া দেয়। সংবাদটি ছিল, চাঁদপুরের কোনো এক গ্রামে যখন সরকারি অনুদান নিতে আসা কিছু নারীকে জটলা না করে সামাজিক দূরত্ব রেখে দাঁড়াতে বলা হলো, তখন একজন নারী বলে ওঠেন, ‘সামাজিক দূরত্ব? হেইডা আবার কী? আমরা আইছি চাউল নিতে। চাউলডা পাইলেই চইলা যামু। করোনারে ভয় করি না। আগে খাইয়া বাঁইচ্চা লই।’
এই নারীর কথা আমার কানে আজ অনুরণন করছে যখন সারা দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে সামাজিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে শহরের পর শহর তালাবন্দী করতে হচ্ছে, আর লাখ লাখ লোক কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে আছে। আছে ভয়ে। যত না করোনার জন্য, তার চেয়ে বেশি জীবিকার জন্য, ঘরে অন্ন না থাকার জন্য।
পৃথিবীজুড়ে যে আতঙ্ক সবাইকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তা সামাল দেওয়ার জন্য প্রায় সব দেশই এখন পর্যন্ত যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে, সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা তার মধ্যে প্রধান। এর সঙ্গে যেসব এলাকায় ভাইরাসের প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকা লকডাউন বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে লোকজন যত্রতত্র ঘোরাফেরা না করে বাড়িতে বসে থাকে—খুব জরুরি কাজ না থাকলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের নিয়মকানুন কোনো না কোনোভাবে চালু হয়েছে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে। জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব দোকানপাট, বড় বড় মল, ছোট–বড় ব্যবসা, সব বন্ধ। আমেরিকার বড় বড় নগরী, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, সান ফ্রান্সিসকোর রাস্তা গাড়িঘোড়াশূন্য, মানুষশূন্য, দেখে মনে হবে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি শহরগুলোকে স্থবির করে ফেলেছে। এসব সম্ভব হয়েছে আতঙ্কের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সচেতনতা, স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ এবং চেষ্টায়। কিন্তু এ সত্ত্বেও এর মধ্যে বহু জায়গায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। তবু আশার কথা এটাই যে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেখছেন, স্বাস্থ্যবিধান আর শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য অনেক জায়গায় ভাইরাস কম ছড়াচ্ছে।
এ তো গেল ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা। কিন্তু মাসাধিক কাল ধরে শহরের পর শহর অবরুদ্ধ থাকা আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোটি কোটি লোক কর্মহীন বা ছাঁটাই হবে, এর প্রতিকার কী? এই অবরুদ্ধ পরিবেশ খুব শিগগির যে শেষ হবে, তারও কোনো আভাস এ মুহূর্তে নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র সরকার তড়িঘড়ি আইন পাস করে কর্মহীনদের আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সাহায্যের জন্য কয়েক হাজার কোটি ডলারের তহবিল সৃষ্টি করেছে। আশা, এতে অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়বে না। তবু এটা শুধু আশা, ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কত তাড়াতাড়ি এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসে আর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়।
দুঃখের বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থান আর বাংলাদেশের অবস্থান এক নয়। আজকে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা দমনে সরকারি এবং বেসরকারি যে প্রচেষ্টা এবং সহায়তা আছে, সেটা বাংলাদেশে সম্ভব নয়। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের ৮০ ভাগ জনসাধারণ জীবিকার জন্য দৈনন্দিন কর্মনির্ভর। তা সে গ্রামে বা শহরেই হোক, চাষে হোক, কলকারখানায় হোক বা যানবাহনে। দিনমজুর বা গৃহহীনদের কথা বাদই দিলাম। শ্রমনির্ভর জনগোষ্ঠীকে বেশি দিন অবরুদ্ধ রাখা বা তাদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করার নির্দেশ দেওয়া খুব কঠিন কাজ। একে তো ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য কাজের তাগিদ, অন্যদিকে এই ভাইরাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভ্রান্তি।
আমাদের দেশে সাধারণ লোক একটি রোগ সম্পর্কে জানতে পারে সে রোগের দৃশ্যত উপসর্গ বা লক্ষণ থেকে। আগে বসন্ত হলে তা রোগীর গায়ে দেখা দিত, কলেরা হলে তা সঙ্গে সঙ্গে বুঝত, ডেঙ্গু কিংবা ম্যালেরিয়া শরীরে তার লক্ষণ থাকে। কিন্তু এ নতুন রোগ এমনই, যা কেউ আক্রান্ত হলেও অনেকের কোনো লক্ষণ থাকবে না (যাদের বলা হয় উপসর্গবিহীন), অনেকেই থাকবেন অল্প উপসর্গ নিয়ে, যা দেখে কেউ তাকে ভাইরাসে আক্রান্ত বলে মনে করবেন না, ততক্ষণ তাঁর কোনো পরীক্ষাও হবে না। ফল এই দাঁড়ায় যে আমাদের এই বিরাট জনগোষ্ঠীকে এই ভাইরাস সম্পর্কে ব্যাপকভাবে শিক্ষিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এ শিক্ষা দেওয়ার যে সময় তা দিতে দিতে আমাদের যে দুটো জিনিস সামলাতে হবে তা হচ্ছে, ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সার্বিক জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতি, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং হাসপাতাল প্রস্তুতি। এর সঙ্গে প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে কর্মহীনদের জন্য আর্থিক সাহায্য, গ্রামে গ্রামে ত্রাণ ব্যবস্থা আর বহুলভাবে কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প প্রণয়ন।
সরকার এর মধ্যে কৃষিকাজ, পোশাক, এবং অন্যান্য শিল্পের জন্য তহবিল ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কথা থেকে যায়। কত দ্রুত এ সাহায্য প্রকৃত ব্যক্তি বা প্রকৃত প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাবে। এ সাহায্য পেতে মানুষের কত আমলাতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। আর এ সাহায্য কি আদৌ পৌঁছাবে চাঁদপুরের সেই নারীর কাছে, যিনি সরকারি অনুদান নিতে সামাজিক দূরত্বের তোয়াক্কা করেন না, যাঁর কাছে পেটের ক্ষুধানিবৃত্তি করোনাভাইরাসের চেয়ে বেশি ভয়ংকর? তাই তাঁদের কাছে জীবিকা প্রয়োজন, কারণ বেঁচে থাকতে এটাও দরকার।
সরকারের কাছে এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষকে এই ভয়াবহ ভাইরাস থেকে বাঁচাতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে তার জীবিকাকেও বাঁচাতে হবে। আশা করছি, আমরা দুটোই পারব।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

করোনা মোকাবিলার সফল উদাহরণ বাড়ির পাশের কেরালা

ভারতের কেরালায় করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে তারা। ছবি: আইএএনএসভারতের কেরালায় করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে তারা। ছবি: আইএএনএসকিউবার পর এ মুহূর্তে কেরালাকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় মাতামাতি হচ্ছে। কিন্তু কেন? সেটা কি কেবল ভাইরাস–যুদ্ধে নতুন ধারার প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে? নাকি ‘কেরালা মডেল’ আরও বেশি কিছু? বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য সেখানে শিক্ষণীয় কিছু আছে কি না? আলাপের শুরুতে করোনাকালে কেরালা কী করেছে, সেটাই জানা যাক।
১০০ দিনে মাত্র তিনজনের মৃত্যু
কেরালা ভারতের ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্য। এখানকার প্রচুর মানুষ বিদেশে থাকে। জনসংখ্যায় বয়স্কদের সংখ্যা বেশি। চীনে প্রচুর ছাত্রছাত্রী ছিল তাদের। আবার বছরে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক আসে এখানে। করোনার অত্যধিক সংক্রমণের সব বড় শর্তই ছিল কেরালায়।
কিন্তু কেরালার রাজ্য সরকার প্রথম থেকে অত্যধিক সতর্ক ছিল। বিমানবন্দরগুলোয় কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। নয়টি দেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে যেতে হতো। ভারতের অন্যত্র এই নিয়ম করা হয় কেরালার দুই সপ্তাহ পরে।
কেরালার সরকার জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কাজটি আমলাতান্ত্রিকভাবে করেনি। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা হয়। ‘সামাজিক দূরত্ব’ কথাটাও এড়িয়ে যায় তারা। সেখানে এটাকে বলা হয় ‘শারীরিক দূরত্ব, কিন্তু সামাজিক সংহতি’। স্লোগানের মধ্যেই তাদের আবেদনটা লুকানো ছিল। অনেকে বিস্মিত হবেন জেনে, করোনা নিয়ে কেরালায় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে ২৬ জানুয়ারি। বহু দেশের বহু আগে।
কেরালায় প্রথম সংক্রমণের ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সর্বশেষ ১২ এপ্রিল সেখানে করোনায় চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৪৬ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে চলে গেছেন ১২৩ জন। আর মারা গেছেন মাত্র তিনজন।
৫ এপ্রিল থেকে হিসাব করে দেখা গেছে, সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা সেখানে সব সময় চার শর নিচেই থাকছে। অথচ বাকি ভারতে সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে এবং ১০ হাজার ছুঁই–ছুঁই করছে। সর্বশেষ তিন দিনে কেরালায় মাত্র ২৮টি কেস শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে তারা আইসোলেশনে রাখতে পেরেছে এবং সেটা যার যার বাড়িতে। ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি করোনা টেস্ট করেছে কেরালা। এই সংখ্যা প্রতি ১০ লাখে প্রায় ৩০০। ভারতে এই হার সর্বোচ্চ।
কেরালার সরকারি একটি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করছেন এক স্বাস্থ্যকর্মী। ছবি: এএফপিকেরালার সরকারি একটি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করছেন এক স্বাস্থ্যকর্মী। ছবি: এএফপিকেরালা তিনটি পদক্ষেপ নিয়েছিল একই সঙ্গে। আগ্রাসী হারে পরীক্ষা, অসুস্থ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে যারা এসেছে, তাদের পুরো চেইন চিহ্নিত করা এবং রান্না করা খাবার সরবরাহ করা। এই তিনটি কাজ তারা একই সঙ্গে পরিচালনা করেছিল। প্রায় সব দল সেখানে মানুষকে খাওয়ানোর কাজে প্রতিযোগিতা করে নেমে পড়েছে। কোভিড-১৯-এ কেরালায় সংক্রমিত ব্যক্তিদের মৃত্যুর হার এক ভাগের কম। এটা বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে নিচু হার। এটা সম্ভব হয়েছে আসলে আগে থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রাজ্যটির অগ্রগতির কারণে।
২৫ শতাংশ পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্যাকেট
আগেই বলেছি, রাজ্যটি করোনা মোকাবিলায় একই সঙ্গে মেডিকেল এবং নন-মেডিকেল ব্যবস্থা নিয়েছিল। গত ১৯ মার্চ ওই রাজ্যে দুর্যোগকালীন অর্থনৈতিক সহায়তার নানান প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর আকার ছিল মাত্র সাড়ে তিন কোটি নাগরিকের রাজ্যে ২০ হাজার কোটি রুপি। ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার ৮৭ লাখ পরিবারকে (জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ) বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটা প্যাকেট পৌঁছে দিয়েছে। এ রকম প্যাকেট দেওয়া হচ্ছে ১৪ দিনে একবার। এক হাজার রুপিতে তৈরি এ প্যাকেটে চিনি থেকে রান্নার তেল পর্যন্ত ১৭ ধরনের জিনিস থাকছে। এর ফলে মানুষ ঘরে থাকছে এবং না খেয়ে মারা যাচ্ছে না।
এর বাইরেও অনেক সহায়ক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে ঘরবন্দী মানুষের জীবনকে সহজ করতে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের বাধ্য করা হয়েছে যার যার হিসাবের বিপরীতে ৩০ ভাগ বেশি ব্যান্ডউইথ দেওয়ার জন্য। আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিদের সাহস দিতে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে করোনাকালে এসব পদক্ষেপের কারণেই ‘কেরালা মডেল’ শব্দযুগল চালু হয়েছে, এমন নয়; বহুদিন থেকেই কেরালা উন্নয়নের বিকল্প একটা মডেল। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ‘গুজরাট মডেল’–এর পক্ষে এত বুদ্ধিজীবী সারাক্ষণ প্রচারে লিপ্ত থাকে যে কেরালার কথা বাংলাদেশ-পাকিস্তান-নেপাল তো দূরের কথা, খোদ ভারতেও আড়ালে পড়ে যায়।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেরালার নেতৃবৃন্দ ‘প্রবৃদ্ধি’, ‘মাথাপিছু আয়’ ইত্যাদি সূচকের দিকে ছোটেননি। নাগরিকদের ছলনায় মুগ্ধ করার চিন্তাতাড়িত ছিলেন না তাঁরা; বরং চেষ্টা করা হয়েছে জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর। এই চেষ্টাটা এমনভাবে করা হয়েছে যেন পুরো জনপদে সবার জীবনযাত্রার মান বাড়ে। আশপাশের রাজ্য ও দেশগুলোতে যেমন কিছু ঝলমলে শহর, শপিং মল বা ইট-সিমেন্টের বড় অবকাঠামোকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়, কেরালা তা করেনি। তারা জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিশেষভাবে রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর।
ভারতে মানব উন্নয়ন সূচকে কেরালা প্রথম
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় মূল বিনিয়োগটা রাজ্য সরকারই করেছে কেরালায় বরাবর। এ দুটোর জন্য বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি মানুষকে। অর্থাৎ রাজ্যের সম্পদ সেখানে কিছু মানুষের কাছে ক্রমে পুঞ্জীভূত হতে না দিয়ে ক্রমাগত বণ্টন ও পুনর্বণ্টনের চেষ্টা করা হয়েছে (বিদ্যমান পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই যতটা পারা যায়)। এতে ফল হয়েছে এই, ভারতে ৩১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কেরালা মানব উন্নয়ন সূচকে ২০১৮ সালে যখন প্রথম স্থানে ছিল, গুজরাট তখন ছিল ২১তম।
কেরালা ভূমি সংস্কার দিয়ে শুরু করে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বনেদি গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা এ রকম কিছু করার কথা এখন আর ভাবেনও না। কেরালা কেবল এই একটা কাজ করে গ্রামীণ কৃষিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। কৃষিশ্রমিকদের জন্য পেনশন পর্যন্ত চালু করে তারা। ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সরবরাহ সেখানকার একটা পুরোনো কর্মসূচি। ভারতে যেসব রাজ্যে ক্ষুধার সমস্যা কম, তার মধ্যে পাঞ্জাবের পরই কেরালার অবস্থান। পাঞ্জাব খাদ্য ফলিয়ে এক নম্বরে। আর কেরালা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুই নম্বরে।
কেরালার শিক্ষা মডেল বলা যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা। ১৯৫১ সালে রাজ্যটিতে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৭ শতাংশের মতো। এখন তা ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ। অথচ সর্বভারতীয় গড় ৭০–এর কাছাকাছি।
কেরালার ইরনাকুলাম মেডিকেল কলেজে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ছবি: এএফপিকেরালার ইরনাকুলাম মেডিকেল কলেজে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ছবি: এএফপিকেরালার মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলাম শুরুতে। কেবল একটি তথ্য দিয়ে এর গভীরতা বোঝা যাবে। ভারতজুড়ে মোদি-অমিত শাহ জুটির যখন জয়জয়কার, তখন কেরালার ১৪০ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপি জিতেছে মাত্র একটি আসনে। লোকসভায় এখনো বিজেপি কিছু পায়নি এখানে।
কেরালায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে বামপন্থীদের সঙ্গে মধ্যপন্থীদের। এখন পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকলেও সেখানে বিরোধী কংগ্রেসও অনেক বছর ক্ষমতায় ছিল।
আরএসএসের মতো শক্তি এখনো সেখানে যে সুবিধা করতে পারেনি, তার বড় এক যোগসূত্র রয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় রাজ্যটির ভালো অবস্থার মধ্যে।
৫৫ শতাংশ হিন্দুর পাশাপাশি প্রায় ৪৫ শতাংশ মুসলমান ও খ্রিষ্টান রয়েছে কেরালায়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা অতি বিরল। এর কারণ খুব সহজ। শাসকদের তরফ থেকে সে ধরনের উসকানি দেওয়া হয় না। কেরালার লোকেরা তাই গর্ব করে বলে, এটা ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ’!
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পুরোনো চার্চ, সেনেগগ, মসজিদগুলোর অক্ষত অবস্থা রাজ্যটির বিকল্প উন্নয়ন মডেলের আরেক প্রতীক। যদি এসব সৌহার্দ্যকে ‘উন্নয়ন’ বলতে মানুষ আদৌ শেখে কোনো দিন।
‘কেরালা মডেল’ নিখুঁত নয় অবশ্যই
হ্যাঁ, কেরালা মডেল নিখুঁত নয়। এখনো সেখানে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাই কায়েম রয়েছে। আবার ‘গুজরাট মডেল’–এর মতো ঔজ্জ্বল্যও নেই তাতে। মাথাপিছু আয়ের হিসাবে কেরালার মানুষকে ধনীও বলা যায় না। কিন্তু উন্নয়নকে মাথাপিছু গড় আয় আর প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করার চলতি মডেলটি বদলের শক্ত বার্তা দিচ্ছেন পিনারাই বিজয়ন ও তাঁর সহযোগীরা। করোনা মোকাবিলায় সফলতা তাঁদের সব চেষ্টাকে নতুন করে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর মনোযোগে নিয়ে এল আবার।
আলতাফ পারভেজ: গবেষক

প্রধানমন্ত্রীর কাছে অধ্যাপক রাশিদা বেগমের খোলা চিঠি




প্রধানমন্ত্রীর কাছে অধ্যাপক রাশিদা বেগমের খোলা চিঠি


বৈশ্বিক করোনা মহামারীর এই দুঃসময়ে দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থা বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন বিশিষ্ট গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম। তার নিজের ফেসবুকে পোস্ট করা চিঠিটি নিচে তুলে ধরা হলো।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনাকে জানাই সালাম ও শ্রদ্ধা।
আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক। অত্যন্ত সন্মান এবং বিনয়ের সাথে আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, কিছু তথ্য আপনার কাছে হয়তো বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেটা প্রমাণিত হয় ডাক্তারদের প্রতি আপনার সেদিনের অসোন্তোষের বহিঃপ্রকাশে। ডাক্তারদের শেষ ভরসার জায়গা থেকে অবিশ্বাস আর অসোন্তোষ প্রকাশে ডাক্তারদের মনোবল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
একটি মরণঘাতি এবং সাংঘাতিক ছোঁয়াচে রোগের চিকিৎসা কাছে থেকে দেওয়া ভীষণ মানসিক চাপসম্পন্ন। আইসিইউতে একটি মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চাপই অপরিসীম। এর সঙ্গে যখন যোগ হয় নিজের বেঁচে থাকার চাপ তখন সেই চাপ কত ভারী হতে পারে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল বা চেম্বার (আনডায়াগনোজড ক্যারিয়ারের জন্য) সবক্ষেত্রেই কিছু চাপ থাকে। সমাজের কিছু মানুষের তীব্র নেতিবাচক সমালোচনাতেও মনের ওপর চাপ পরে। তাই এই দুঃসময়ে, মহা দুর্যোগে আপনি একমাত্র অভিভাবক যার অভয়বাণী আর উৎসাহ না পেলে তারা ভেঙে পরে।
দুটো বিষয়ের ব্যাখ্যা
১.
প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে কেউ পালায়নি। চেম্বার বন্ধ সংক্রমণ ছড়ানো প্রতিরোধে সহায়তা করেছে। পেশেন্ট থেকে পেশেন্টে, পেশেন্ট থেকে ডাক্তারে এবং ডাক্তার থেকে অজস্র পেশেন্টে। অনেকেই শুধু যে আয় বন্ধ তা নয়, অনেক খরচের বোঝা মাথায় নিয়ে চেম্বার বন্ধ রেখেছে। তাতে পেশেন্টদের স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অসুবিধে হলেও এই দুর্যোগে আহামরি অসুবিধে হচ্ছে না। যখন যার দরকার টেলিফোন, ই মেইল, হোয়াটস অ্যাপ, ম্যাসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কনসাল্ট্যান্সি নিচ্ছে। একজন চিকিৎসক ঘরে বসে যথাথাসম্ভব সাপোর্ট দিচ্ছেন। বুঝদার পেশেন্টরা নিজেরাই ঘর থেকে বের হচ্ছে না। যত কম বের হবে ততই মঙ্গল। চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া হয় না, চিকিৎসাপত্র লেখা হয়। যেটা আমরা এখন বিভিন্নভাবে দিয়ে আসছি। বেশী অসুবিধে যার হবে সে ইমারজেন্সিতে আসবে। তাই সব সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালেও বহির্বিভাগ বন্ধ থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়।
চিকিৎসক রিজার্ভ রাখারও একটি ব্যাপার আছে। সকলকে একসঙ্গে এক্সপোজড করলে চিকিৎসক সঙ্কট হবার আশঙ্কা থাকে। কারণ কেউ অসুস্থ থাকবে, কেউ কোয়ারেন্টিনে থাকবে। সত্য লুকানো কোভিড রোগীদের কারণে অনেক চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী অলরেডি কোয়ারেন্টিনে। তাই বহির্বিভাগ বন্ধ এবং ইনডোরেও ভাগ করে রোস্টার করে ন্যুনতম চিকিৎসক দিয়ে চালানো জরুরি।
২.
পেশেন্ট দ্বারে দ্বারে ঘুরে মৃত্যুবরণ করেছে। ডাক্তারসমাজ সেজন্য যারপরনাই দুঃখিত। কিন্তু এই দ্বারে দ্বারে ঘোরার জন্য দায়ী ব্যবস্থাপকগণ। শুরু থেকে কভিড রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। একটিমাত্র জায়গায় করোনা টেস্টকে কুক্ষিগত করে রাখার ফলে সন্দেহজনক কোভিড রোগী যখন যে হাসপাতালে গেছে তাদের টেস্টের সুবিধা ছিল না।
ডেজিগনেটেড হাসপাতাল পজিটিভ না হলে নেবে না। কারণ সে নেগেটিভ হলে ওখানে ঢুকে ইনফেক্টেড হতে পারে। অন্য হাসপাতাল পজিটিভ হলে নেবে না কারণ সে অন্য অনেক পেশেন্টদের ইনফেকটেড করতে পারে।
কি প্রাইভেট কি সরকারি হাসপাতালগুলোতে তখনতো দূরের কথা এখনও সব জায়গায় কোনো ট্রায়াজের ব্যবস্থা নেই। টেস্টিং এর ব্যবস্থা নেই। আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন জোনে ভাগ করা নেই। তাহলে সন্দেহভাজন পেশেন্টকে কিভাবে ভর্তি করবে? এখনও বিভিন্ন জায়গায় কোভিড পেশেন্ট তথ্য গোপন করে ঢুকে যাচ্ছে অন্য পেশেন্টের মধ্যে। ফলাফল সব এক্সপোজড স্বাস্থ্যকর্মীর কোয়ারেন্টাইন। ডাক্তার এবং পেশেন্ট উভয়েই এখানে এইসব অব্যবস্থাপনার শিকার। ভাইরাসকে এয়ারপোর্ট দিয়ে অবাধে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই ভাইরাস এখন সারা দেশে। প্রতিরোধের মূল অস্র ভেঙে দিয়ে তার ভার বহন করতে হবে চিকিৎসককে।
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি বহুফাটলবিশিষ্ট ছেড়া প্যান্টের মতো। সামনে জিপারটা একটু ভালো আছে বলে সামনের আব্রুটুকু রক্ষা পেয়েছে এতদিন। আর সেই জিপার হলো ডাক্তার। যে এতদিন কোনোরকমে ঢেকে রেখেছে। এখন করোনার প্রলয়ঙ্কারী তান্ডবে আশপাশ, পিছন সব দেখা যাবে বলে শুধু দুর্ঘটনাই শুনতে হবে। জিপারকে আর দোষ দিয়েন না। যেখানে টারশিয়ারি লেভেল হাসপাতালে আইসিইউ নেই সেখানে ডাক্তারদের আর কি করার আছে। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর নেই, থাকলেও বিকল। চালানোর মতো পর্যাপ্ত এক্সপার্টও নেই।
স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে ভালনারেবল। আক্রান্তদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডাক্তার। অলরেডি ২৯ জন আক্রান্ত তিনজন আইসিইউতে। মারা গেছে একজন হেলথ এসিস্ট্যান্ট। গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃংখলা বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী এবং অন্যান্যদের সাথে স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বিরাট তফাৎ হলো স্বাস্থ্যকর্মীরা ভাইরাসের ডিপোর মধ্যে থাকে, অন্যরা নয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের রিপিটেড এক্সপোজারে ভাইরাল লোড অনেক অনেক বেশী থাকে। তাই এদের ঝুঁকির সাথে অন্য কারো ঝুঁকির তুলনা হবে না। এ দেশের কিছু অবুঝ মানুষের অভিযোগ আর হলুদ সাংবাদিকদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লেখায় ডাক্তার সমাজ আজ ভিলেন। মন খারাপ হলেও কেউ পাত্তা না দিয়ে কাজ করে যায়।
কিন্তু তার নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে কাজ করবে কেমন করে? যথাযোগ্য পিপিই সকল করোনা রোগীর সেবকদের কাছে যাওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। ডাক্তারদের অনেকেরই যাতায়াত থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির লোকজনও এদের জন্য ঝুঁকিতে। এদের যাতায়াত, থাকা, খাওয়ার সুবিধাদি না দিলে সার্ভিস ব্যহত হতে বাধ্য। সেই সুবিধা না দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসাশনিক হেড করোনার চিকিৎসারত ডাক্তারদের তার বাসা থেকে দূরের রেস্ট হাউজে থাকতেও বাঁধা দিচ্ছে। সিলেট থেকে করোনায় আক্রান্ত ডাক্তার উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে চাইলে প্রশাসনের কোনো সাহায্য পায়নি। এই ডাক্তারদের সাপোর্ট না দিলে তারা কোথায় যাবে এবং রাষ্ট্রীয় কাজ করবে কিভাবে? ডাক্তার না বাঁচলে কেউ বাঁচবে না। ডাক্তারের নানানরকম খারাপই থাকতে পারে, কিন্তু রোগীর জীবনের জন্য যুদ্ধ করেনা এমন কোনো ডাক্তার নেই।
মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রশাসন থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত আমরা প্রস্তুত, আমরা প্রস্তুত বলে বলে ডাক্তার এবং জনগণের সাথে চরম প্রতারণা করে এসেছে এবং ডাক্তার ও জনগণকে মুখোমুখি দাড় করিয়েছে। কাউকে বাঁচাবার সামর্থ না থাকলেও ডাক্তাররাই শেষ রক্ষাকবচ। তাদের হমকি ধামকি না দিয়ে একটু আপনার প্রার্থনায় রাখুন। কেউ সাজা পাবার মতো কাজ করলে বিভাগীয় শাস্তির যে বিধান আছে সে পাবে। কারণ দর্শানো ছাড়া এই অস্থিতিশীল মুহূর্তে জনসন্মুখে চিকিৎসককে বরখাস্ত করা কতখানি যুক্তিযুক্ত ভেবে দেখতে হবে। এতে সকল চিকিৎসকের মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় কিনা সেটাও চিন্তার বিষয়। একজন দক্ষ ডাক্তার তৈরি হতে বহু সাধনা, বহু ত্যাগ আর বহু দিনের দরকার। ওদেরকে আমরা যেন মনে ও শরীরে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।
তাই ভেতরের খবর জানার জন্য এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু প্রশাসনের লোক নয়, প্রশাসনিক ডাক্তারও নয়, যারা রোগীর চিকিৎসা করে তাদের কথা দয়া করে শুনুন ফ্রন্ট ফাইটারদের একমাত্র এবং শেষ ভরসা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ডাক্তার রোগীকেও বাঁচাতে চায় নিজেও বাঁচতে চায়। এই আপদকালীন সময়ের প্রচন্ড সমন্বয়হীনতায় আপনার হস্তক্ষেপে প্রলয় কমে যাবে নিশ্চয়।
শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় নিবেদিত
আপনার একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক
অধ্যাপক রাশিদা বেগম
চিফ কনসাল্ট্যান্ট, আই সি আর সি
ট্রেজারার, ও জি এস বি
বোর্ড মেম্বার, এশিয়া প্যাসিফিক ইনেশিয়েটিভ অব রিপ্রোডাকশন
মেম্বার, আমেরিকান সোসাইটি অব রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন
মেম্বার ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফার্টিলিটি সোসাইটি
মেম্বার, ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এম্ব্রায়োলজি
মেম্বার, ওয়ার্ল্ড এন্ডোমেট্রিওসিস সোসাইটি।