এদেরই একজন রমজান মিয়া পরিবার নিয়ে এখন শীতে কাবু। নিজের জন্য না হোক, শিশু সন্তানটির জন্য একটি কম্বল চাইছিলেন তিনি।
শনিবার
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জিজ্ঞাসায় রমজান কাশতে কাশতে বললেন, “বিশ্বাস
করেন ভাই, গত কয়ডা রাইত ঘুমাইতে পারি নাই। বাচ্চাডারে একবার তার মায়ে
আরেকবার আমি বুকের মইদ্যে নিয়া বইসা আছিলাম।
“শুনছি শীত পড়লে মানুষজন
কম্বল দিয়া যায়। গত দুই দিন কাপড় নিয়া কেউ আসে নাই। আইজকা বয়স্ক একজন
মহিলা কয়েকজনরে চাইর-পাঁচটা কম্বল দিয়া গেছে।”
রমজান একটি কম্বল পেলেও সুরুজ আলীর তা জোটেনি। তিনি এখনও আশায় আছেন।
সুরুজ
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কাগজ, প্লাস্টিকের বোতল, কাঠ,
স্যান্ডেল এইডা সেইডা জ্বালায়া রাতটা পার করি। তয় আগুন জ্বালায়া আর কতক্ষণ
থাকা যায়? শুনছি আইজ নাকি কম্বল নিয়া আসব।”
সাত মাস ধরে সুপ্রিম
কোর্টের সামনের ফুটপাতে রয়েছেন জামালপুরের ইসলামপুরের রমজান; আড়াই বছর আগে
সেখানে বাড়ি-ঘর সবই ছিল তার। যমুনার ভাঙনে ভিটা হারিয়ে এখন ঢাকায় তিনি।
কিছু দিন রিকশা চালালেও শারীরিক অসামর্থ্যের কারণে এখন তাও পারেন না।
রাজধানীর বংশালে বিভিন্ন দোকানে ট্রলিতে মাল টানেন মজিবর মিয়া। বয়স আনুমানিক ৬০ বছর। গলির এক চায়ের দোকানে কথা হয় তার সঙ্গে।
মজিবর মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শীতে পিঠ আর কোমরের ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় গত দুদিন কাজ করতে পারেননি।
স্ত্রী, মেয়ে ও এক নাতিকে নিয়ে শাহজাহানপুর রেল কলোনিতে থাকেন মজিবর। ঘরে খাট না থাকায় তোষক পেতে মেঝেতেই থাকতে হয় তাদের।
“যে
শীত পড়িচ্ছে, একখানি কম্বল আর চাদর দিয়া কি শীত সামাল দেওয়া যায়! ফোলরের
(ফ্লোরের) ঠাণ্ডাতেই কোমড়ের ব্যথাটা জাগিচ্ছে। মেয়েডা বাসাবাড়িত কাজ করে।
সেই চালাইচ্ছে।”
ফকিরাপুল এলাকায় কয়েকটা মেসে রান্না, ধোয়ামোছার কাজ করেন আসিয়া। তিনিও ওই এলাকাতেই থাকেন।
শীতের কারণে নিয়মিত কাজে যেতে পারছেন না আসিয়া বেগম
আসিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ঠাণ্ডায় পানি বিষের মত
লাগে। শইল কাঁপতে থাকে। চুলার উপরে হাত ধইরা রাখি। গতকাইল কামে যাই নাই।”
রাজধানীর ছিন্নমূল রমজান কিংবা সুরজদের মতো উত্তরাঞ্চলে প্রচণ্ড শীতে কাবু মানুষরাও কম্বলের আশায় রয়েছেন।
শীতে ‘কামাই না থাকিয়া হামার মরণ হইছে বাহে’
রংপুর নগরীর আলমনগর এলাকার আজিমা বেগম বলেন, “এই শীতে আর জীবন বাঁচে না। এখন পর্যন্ত একখানা গরম কম্বল পাই নাই।”
এই
এলাকার আরজিনা বেগম, শহিদা বেগম কিংবা রেল স্টেশন এলাকার অলিমা বেওয়া,
কিংবা নুরপুর এলাকার আছিয়া বেগম ও বুলু মিঞার আকুতি একটি কম্বলের জন্য।
অলিমা বলেন, “সরকারও হামার দিকে দ্যাখে না। আপনারা যদি পান, তাহলে হামাক একখান করে গরম কম্বল দেন।”
তবে তাদের কম্বল এখনও না মিললেও আশ্বাস মিলেছে রংপুরের জেলা প্রশাসক আহসান হাবিবের কাছ থেকে।
তিনি
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জেলায় শীতার্ত মানুষের মধ্যে ২০ হাজার
কম্বল ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এখনও অনেক মজুদ আছে, কোনো সমস্যা হবে না।
রমজান বা সুরুজের মতো মানুষদের জন্য আশ্বাস এসেছে ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো.শাহিদুজ্জামানের কাছ থেকেও।
তিনি
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রত্যেকটা জেলা প্রশাসন সারা দেশে
শীত বস্ত্র বিতরণ করছে। অলরেডি ঢাকাতেও আমরা শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। আরও
বিতরণ করা হবে।”
তীব্র শীতের দেশের কোনো কোনো এলাকা ঢাকা পড়েছে কুয়াশায়। ঢাকার অবস্থা সেরকম না হলেও সূর্যের দেখা মিলছে না তিন দিন হল।
তবে
শনিবার সকাল থেকে ঢাকার পারদ উঠতে শুরু করেছে। সকালে ঢাকার ১২ দশমিক ২
ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও দুপুরের পর তা ১৭ ডিগ্রিতে উঠেছিল; যদিও সন্ধ্যার
পর আবার তাপমাত্রা নেমে আসে ১৫ ডিগ্রিতে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে,
শৈত্যপ্রবাহ কেটে গেলেও শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ (জেট বায়ু) বেশি সক্রিয় থাকায়
এবং কুয়াশা ও জলীয় বাষ্পে আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ
হাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়োন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এরকম আবহাওয়া পৌষ মাসে
খুবই স্বাভাবিক। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও শীতের তীব্রতা আরও দুয়েকদিন
থাকবে।”
শীতের তীব্রতা ভিড় বাড়িয়েছে ঢাকা শিশু হাসপাতালে
শীতের এই তীব্রতায় শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছে শ্বাসকষ্টসহ ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগে। গত কয়েকদিনে হাসপাতালে তাই বেড়েছে রোগীর ভিড়।
আবার জীবিকার তাগিদে অনেকে শীতে রোগের কষ্ট নিয়েই নামছেন পথে।
ঢাকার
রামপুরার রিকশাচালক মান্নান মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালেন
নিজের শ্বাসকষ্টের কথা। রামপুরা ওয়াপদা কলোনির গ্যারেজ থেকে নিয়মিত রিকশা
নেন তিনি।
শনিবার সন্ধ্যা ১৬০ টাকা আয় করে আর রিকশা চালাতে চাইছেন না তিনি; যদিও এই টাকার মধ্যে ৭০ টাকা দিয়ে দিতে হবে রিকশামালিককে।
আরেক রিকশাচালক হাসমত মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হাঁপানি আছে তো, শীতে বাড়ে। আইজ আর পারুম না।”
শীতের কারণে রুটিতে পরিবর্তন এনেছেন রিকশাচালক আলামিন
খিলগাঁওয়ের নন্দিপাড়ার রিকশাচালক মো. আলামিন বিডিনিউজ
টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানালেন, আগে রাতেও তিনি রিকশা চালাতেন, কিন্তু শীতের
তীব্রতার কারণে সে রুটিনে পরিবর্তনে এনেছেন।
আলামিন বলেন, “রাতে ভাড়া
একটু বেশি পাওয়া যায়, রাস্তাঘাটে জ্যামজুম থাকে না। এই কারণে রাইতেই
চালাইতাম। কিন্তু শীতের কারণে গত দুইদিন ধইরা রাইত ৮টার পরে প্যাসেঞ্জার
পাওয়া যায় না।”