Tuesday, April 14, 2020

দায়িত্ব নিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ: কোভিড-১৯ আক্রান্ত চিকিৎসক

Monday, April 13, 2020

করোনার নমুনা সংগ্রহে সারা দেশে বসছে ৩২০টি বুথ!




করোনার নমুনা সংগ্রহে সারা দেশে বসছে ৩২০টি বুথ!


দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহে ৪৪টি কিয়স্ক বসেছে বাংলাদেশে।
বেসরকারি সংস্থা জেকোজি হেলথ কেয়ারের দারুণ একটি উদ্যোগ। ভয়ংকর করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিমাণ যেমন কমবে, তেমনি পরীক্ষার পরিমাণও কয়েকগুন বেড়ে যাবে। যত বেশি পরীক্ষা ততো বেশি ঘরবন্দি এবং কমবে সংক্রমণের হার।
জানা গেছে, ৪৪টি বুথের মধ্যে ৮টি ঢাকায়, নারায়ণগঞ্জে ৮টি এবং বাকি বুথগুলো দেশের অন্যান্য বিভাগে স্থাপন করা হয়েছে।
দেশজুড়ে পর্যায়ক্রমে ৩২০টি বুথ স্থাপন করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বুড়িগঙ্গার দূষণ কমেছে!‌‌

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০২:৪৭ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২০
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে প্রবেশের প্রতিটি গেটেই তালা ঝুলছে। দু-চারজন ভবঘুরে এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে আছে। একটি গেট খোলা দেখে প্রবেশ করতে যেতেই পথ আগলে দাঁড়ালেন একজন আনসার সদস্য। পরিচয় দেয়ার পর ‘একটু দাঁড়ান’ বলে ভেতরে কারও সাথে কথা বলতে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, ‘দুঃখিত, কিছু মনে করবেন না, বন্দর পরিচালকের অনুমতি ছাড়া টার্মিনালে প্রবেশ করা যাবে না।’ এ কথা বলে মোবাইল নম্বর দিলেন। বন্দর পরিচালক অবশ্য গণমাধ্যমকর্মী শুনে মোবাইল ফোনে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন।
বাইরে থেকে আঁচ করতে পারলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হলো এ যেন অচেনা এক সদরঘাট। চিরায়িত সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের সামনের রাস্তায় দিনভর যানজট, পরিবার-পরিজন, বাক্সপেটরা নিয়ে হাজার হাজার যাত্রীর লঞ্চঘাট অভিমুখে অবিরাম পদচারণা, ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণের ফল বিক্রেতাদের উচ্চস্বরে হাঁকডাক, কুলিদের ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি, ছোটবড় জাহাজ ও লঞ্চের বিকট শব্দে সাইরেন সবকিছু যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে।
Burigonga
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ভয়ংকর ছোঁয়াচে রোগ করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সদরঘাট থেকে সারাদেশে নৌপথে চলাচল বন্ধ থাকায় সদরঘাট এখন জনমানবশূন্য মৃতপ্রায় এক টার্মিনাল।
Burigonga
টার্মিনাল থেকে ঢালু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই সবুজ তরতাজা কয়েকটি বেগুনীরংয়ের ফুলসমেত কচুরিপানা ভাসার দৃশ্য চোখে পড়ল। বিশাল টার্মিনালে কোনো জাহাজ কিংবা লঞ্চ নেই। চারদিকে ধু ধু শূন্যতা। টার্মিনালের বিপরীতে দক্ষিণ পাড়ে হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ নোঙর করে আছে। করোনার কারণে সরকারিভাবে অত্যাবশ্যক প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ থাকায় সদরঘাট টার্মিনালের বিপরীত দিকে কেরানীগঞ্জের রাস্তাঘাটও জনমানবশূন্য।
Burigonga
স্বাভাবিক সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি আলকাতরার রংয়ের মতো কালো দেখালেও সে তুলনায় পানিটা কিছুটা স্বচ্ছ মনে হলো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউয়ে পানি বয়ে চলেছে। সাথে কচুরিপানাও ভেসে যেতে দেখা যায়। করোনা জনজীবন স্থবির করে দিলেও বুড়িগঙ্গা নদীকে নবযৌবন ফিরিয়ে দিচ্ছে।
Burigonga
কিছুদিন আগেও ময়লা পানির দুর্গন্ধে টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা দায় হলেও নাকে দুর্গন্ধ অনেকটা কম লাগল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও বুড়িগঙ্গা নদীতে কোনো যান চোখে পড়েনি। হঠাৎ করে সেনাবাহিনীর স্পিড বোটের টহল দেখা গেল।
শান্ত বুড়িগঙ্গা অচেনা এক নদী দেখে ফিরে আসার সময় সেই আনসার সদস্য বললেন, ‘করোনার কারণে মানুষের অশান্তি অইলেও বুড়িগঙ্গা নদীর শান্তি অইছে।’
এমইউ/বিএ/পিআর

পুলিশের অভিনব উদ্যোগ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করবে ড্রোন

সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করবে ড্রোন
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত, অহেতুক ঘোরাঘুরি এবং আড্ডাবাজি রোধ করতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)’র কোতোয়ালী থানা। থানা এলাকার মানুষজনের উপর নজরদারি বৃদ্ধি করতে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে এ ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে।
কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ইদানিং দেখা হচ্ছে রাস্তাঘাটে লোকজন অহেতুক ঘোরাফেরা ও আড্ডাবাজি করতে। এতে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না। তাই কোতোয়ালী এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ছবি ও ভিডিও ফুটেজ থেকে ভালোভাবেই আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কোতোয়ালী থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে এবং লোকজনকে অহেতুক বাইরে ঘুরাফেরার না করতে সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনে আইন প্রয়োগের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে সেই নির্দেশনা অমান্য করছে কিছু লোকজন। আইন অমান্যকারী এসব লোকজনের উপর নজরদারি বৃদ্ধি করতে ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সিএমপি’র কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন।
রবিবার বিকাল থেকে নগরীর কোতোয়ালি থানা এলাকার জামালখান, কাজীর দেউরি, ব্যাটারি গলি, পাথরঘাটা,  আলকরণ এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ড্রোন উড়ানো হয়। ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও করা হয়। এসব ফুটেজ যাচাই বাছাই শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।
বিডি প্রতিদিন/আরাফাত

জীবন বাঁচানো বড়, না জীবিকা বড়?

ফাইল ছবিফাইল ছবিবাংলাদেশে যখন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার সারা দেশে প্রথম কড়াকড়িভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জনসাধারণকে আহ্বান জানাল, তখন প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন (এপ্রিল ৪) আমাকে খুব নাড়া দেয়। সংবাদটি ছিল, চাঁদপুরের কোনো এক গ্রামে যখন সরকারি অনুদান নিতে আসা কিছু নারীকে জটলা না করে সামাজিক দূরত্ব রেখে দাঁড়াতে বলা হলো, তখন একজন নারী বলে ওঠেন, ‘সামাজিক দূরত্ব? হেইডা আবার কী? আমরা আইছি চাউল নিতে। চাউলডা পাইলেই চইলা যামু। করোনারে ভয় করি না। আগে খাইয়া বাঁইচ্চা লই।’
এই নারীর কথা আমার কানে আজ অনুরণন করছে যখন সারা দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে সামাজিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে শহরের পর শহর তালাবন্দী করতে হচ্ছে, আর লাখ লাখ লোক কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে আছে। আছে ভয়ে। যত না করোনার জন্য, তার চেয়ে বেশি জীবিকার জন্য, ঘরে অন্ন না থাকার জন্য।
পৃথিবীজুড়ে যে আতঙ্ক সবাইকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তা সামাল দেওয়ার জন্য প্রায় সব দেশই এখন পর্যন্ত যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে, সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা তার মধ্যে প্রধান। এর সঙ্গে যেসব এলাকায় ভাইরাসের প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকা লকডাউন বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে লোকজন যত্রতত্র ঘোরাফেরা না করে বাড়িতে বসে থাকে—খুব জরুরি কাজ না থাকলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের নিয়মকানুন কোনো না কোনোভাবে চালু হয়েছে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে। জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব দোকানপাট, বড় বড় মল, ছোট–বড় ব্যবসা, সব বন্ধ। আমেরিকার বড় বড় নগরী, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, সান ফ্রান্সিসকোর রাস্তা গাড়িঘোড়াশূন্য, মানুষশূন্য, দেখে মনে হবে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি শহরগুলোকে স্থবির করে ফেলেছে। এসব সম্ভব হয়েছে আতঙ্কের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সচেতনতা, স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ এবং চেষ্টায়। কিন্তু এ সত্ত্বেও এর মধ্যে বহু জায়গায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। তবু আশার কথা এটাই যে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেখছেন, স্বাস্থ্যবিধান আর শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য অনেক জায়গায় ভাইরাস কম ছড়াচ্ছে।
এ তো গেল ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা। কিন্তু মাসাধিক কাল ধরে শহরের পর শহর অবরুদ্ধ থাকা আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোটি কোটি লোক কর্মহীন বা ছাঁটাই হবে, এর প্রতিকার কী? এই অবরুদ্ধ পরিবেশ খুব শিগগির যে শেষ হবে, তারও কোনো আভাস এ মুহূর্তে নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র সরকার তড়িঘড়ি আইন পাস করে কর্মহীনদের আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সাহায্যের জন্য কয়েক হাজার কোটি ডলারের তহবিল সৃষ্টি করেছে। আশা, এতে অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়বে না। তবু এটা শুধু আশা, ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কত তাড়াতাড়ি এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসে আর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়।
দুঃখের বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থান আর বাংলাদেশের অবস্থান এক নয়। আজকে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা দমনে সরকারি এবং বেসরকারি যে প্রচেষ্টা এবং সহায়তা আছে, সেটা বাংলাদেশে সম্ভব নয়। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের ৮০ ভাগ জনসাধারণ জীবিকার জন্য দৈনন্দিন কর্মনির্ভর। তা সে গ্রামে বা শহরেই হোক, চাষে হোক, কলকারখানায় হোক বা যানবাহনে। দিনমজুর বা গৃহহীনদের কথা বাদই দিলাম। শ্রমনির্ভর জনগোষ্ঠীকে বেশি দিন অবরুদ্ধ রাখা বা তাদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করার নির্দেশ দেওয়া খুব কঠিন কাজ। একে তো ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য কাজের তাগিদ, অন্যদিকে এই ভাইরাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভ্রান্তি।
আমাদের দেশে সাধারণ লোক একটি রোগ সম্পর্কে জানতে পারে সে রোগের দৃশ্যত উপসর্গ বা লক্ষণ থেকে। আগে বসন্ত হলে তা রোগীর গায়ে দেখা দিত, কলেরা হলে তা সঙ্গে সঙ্গে বুঝত, ডেঙ্গু কিংবা ম্যালেরিয়া শরীরে তার লক্ষণ থাকে। কিন্তু এ নতুন রোগ এমনই, যা কেউ আক্রান্ত হলেও অনেকের কোনো লক্ষণ থাকবে না (যাদের বলা হয় উপসর্গবিহীন), অনেকেই থাকবেন অল্প উপসর্গ নিয়ে, যা দেখে কেউ তাকে ভাইরাসে আক্রান্ত বলে মনে করবেন না, ততক্ষণ তাঁর কোনো পরীক্ষাও হবে না। ফল এই দাঁড়ায় যে আমাদের এই বিরাট জনগোষ্ঠীকে এই ভাইরাস সম্পর্কে ব্যাপকভাবে শিক্ষিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এ শিক্ষা দেওয়ার যে সময় তা দিতে দিতে আমাদের যে দুটো জিনিস সামলাতে হবে তা হচ্ছে, ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সার্বিক জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতি, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং হাসপাতাল প্রস্তুতি। এর সঙ্গে প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে কর্মহীনদের জন্য আর্থিক সাহায্য, গ্রামে গ্রামে ত্রাণ ব্যবস্থা আর বহুলভাবে কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প প্রণয়ন।
সরকার এর মধ্যে কৃষিকাজ, পোশাক, এবং অন্যান্য শিল্পের জন্য তহবিল ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কথা থেকে যায়। কত দ্রুত এ সাহায্য প্রকৃত ব্যক্তি বা প্রকৃত প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাবে। এ সাহায্য পেতে মানুষের কত আমলাতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। আর এ সাহায্য কি আদৌ পৌঁছাবে চাঁদপুরের সেই নারীর কাছে, যিনি সরকারি অনুদান নিতে সামাজিক দূরত্বের তোয়াক্কা করেন না, যাঁর কাছে পেটের ক্ষুধানিবৃত্তি করোনাভাইরাসের চেয়ে বেশি ভয়ংকর? তাই তাঁদের কাছে জীবিকা প্রয়োজন, কারণ বেঁচে থাকতে এটাও দরকার।
সরকারের কাছে এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষকে এই ভয়াবহ ভাইরাস থেকে বাঁচাতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে তার জীবিকাকেও বাঁচাতে হবে। আশা করছি, আমরা দুটোই পারব।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

করোনা মোকাবিলার সফল উদাহরণ বাড়ির পাশের কেরালা

ভারতের কেরালায় করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে তারা। ছবি: আইএএনএসভারতের কেরালায় করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক প্রচার চালাচ্ছে তারা। ছবি: আইএএনএসকিউবার পর এ মুহূর্তে কেরালাকে নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় মাতামাতি হচ্ছে। কিন্তু কেন? সেটা কি কেবল ভাইরাস–যুদ্ধে নতুন ধারার প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে? নাকি ‘কেরালা মডেল’ আরও বেশি কিছু? বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য সেখানে শিক্ষণীয় কিছু আছে কি না? আলাপের শুরুতে করোনাকালে কেরালা কী করেছে, সেটাই জানা যাক।
১০০ দিনে মাত্র তিনজনের মৃত্যু
কেরালা ভারতের ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্য। এখানকার প্রচুর মানুষ বিদেশে থাকে। জনসংখ্যায় বয়স্কদের সংখ্যা বেশি। চীনে প্রচুর ছাত্রছাত্রী ছিল তাদের। আবার বছরে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক আসে এখানে। করোনার অত্যধিক সংক্রমণের সব বড় শর্তই ছিল কেরালায়।
কিন্তু কেরালার রাজ্য সরকার প্রথম থেকে অত্যধিক সতর্ক ছিল। বিমানবন্দরগুলোয় কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। নয়টি দেশ থেকে আগত ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে যেতে হতো। ভারতের অন্যত্র এই নিয়ম করা হয় কেরালার দুই সপ্তাহ পরে।
কেরালার সরকার জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কাজটি আমলাতান্ত্রিকভাবে করেনি। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করা হয়। ‘সামাজিক দূরত্ব’ কথাটাও এড়িয়ে যায় তারা। সেখানে এটাকে বলা হয় ‘শারীরিক দূরত্ব, কিন্তু সামাজিক সংহতি’। স্লোগানের মধ্যেই তাদের আবেদনটা লুকানো ছিল। অনেকে বিস্মিত হবেন জেনে, করোনা নিয়ে কেরালায় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে ২৬ জানুয়ারি। বহু দেশের বহু আগে।
কেরালায় প্রথম সংক্রমণের ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সর্বশেষ ১২ এপ্রিল সেখানে করোনায় চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৪৬ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে চলে গেছেন ১২৩ জন। আর মারা গেছেন মাত্র তিনজন।
৫ এপ্রিল থেকে হিসাব করে দেখা গেছে, সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা সেখানে সব সময় চার শর নিচেই থাকছে। অথচ বাকি ভারতে সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে এবং ১০ হাজার ছুঁই–ছুঁই করছে। সর্বশেষ তিন দিনে কেরালায় মাত্র ২৮টি কেস শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে তারা আইসোলেশনে রাখতে পেরেছে এবং সেটা যার যার বাড়িতে। ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি করোনা টেস্ট করেছে কেরালা। এই সংখ্যা প্রতি ১০ লাখে প্রায় ৩০০। ভারতে এই হার সর্বোচ্চ।
কেরালার সরকারি একটি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করছেন এক স্বাস্থ্যকর্মী। ছবি: এএফপিকেরালার সরকারি একটি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করছেন এক স্বাস্থ্যকর্মী। ছবি: এএফপিকেরালা তিনটি পদক্ষেপ নিয়েছিল একই সঙ্গে। আগ্রাসী হারে পরীক্ষা, অসুস্থ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে যারা এসেছে, তাদের পুরো চেইন চিহ্নিত করা এবং রান্না করা খাবার সরবরাহ করা। এই তিনটি কাজ তারা একই সঙ্গে পরিচালনা করেছিল। প্রায় সব দল সেখানে মানুষকে খাওয়ানোর কাজে প্রতিযোগিতা করে নেমে পড়েছে। কোভিড-১৯-এ কেরালায় সংক্রমিত ব্যক্তিদের মৃত্যুর হার এক ভাগের কম। এটা বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে নিচু হার। এটা সম্ভব হয়েছে আসলে আগে থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রাজ্যটির অগ্রগতির কারণে।
২৫ শতাংশ পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্যাকেট
আগেই বলেছি, রাজ্যটি করোনা মোকাবিলায় একই সঙ্গে মেডিকেল এবং নন-মেডিকেল ব্যবস্থা নিয়েছিল। গত ১৯ মার্চ ওই রাজ্যে দুর্যোগকালীন অর্থনৈতিক সহায়তার নানান প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর আকার ছিল মাত্র সাড়ে তিন কোটি নাগরিকের রাজ্যে ২০ হাজার কোটি রুপি। ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার ৮৭ লাখ পরিবারকে (জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ) বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটা প্যাকেট পৌঁছে দিয়েছে। এ রকম প্যাকেট দেওয়া হচ্ছে ১৪ দিনে একবার। এক হাজার রুপিতে তৈরি এ প্যাকেটে চিনি থেকে রান্নার তেল পর্যন্ত ১৭ ধরনের জিনিস থাকছে। এর ফলে মানুষ ঘরে থাকছে এবং না খেয়ে মারা যাচ্ছে না।
এর বাইরেও অনেক সহায়ক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে ঘরবন্দী মানুষের জীবনকে সহজ করতে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের বাধ্য করা হয়েছে যার যার হিসাবের বিপরীতে ৩০ ভাগ বেশি ব্যান্ডউইথ দেওয়ার জন্য। আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিদের সাহস দিতে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে করোনাকালে এসব পদক্ষেপের কারণেই ‘কেরালা মডেল’ শব্দযুগল চালু হয়েছে, এমন নয়; বহুদিন থেকেই কেরালা উন্নয়নের বিকল্প একটা মডেল। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ‘গুজরাট মডেল’–এর পক্ষে এত বুদ্ধিজীবী সারাক্ষণ প্রচারে লিপ্ত থাকে যে কেরালার কথা বাংলাদেশ-পাকিস্তান-নেপাল তো দূরের কথা, খোদ ভারতেও আড়ালে পড়ে যায়।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে কেরালার নেতৃবৃন্দ ‘প্রবৃদ্ধি’, ‘মাথাপিছু আয়’ ইত্যাদি সূচকের দিকে ছোটেননি। নাগরিকদের ছলনায় মুগ্ধ করার চিন্তাতাড়িত ছিলেন না তাঁরা; বরং চেষ্টা করা হয়েছে জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর। এই চেষ্টাটা এমনভাবে করা হয়েছে যেন পুরো জনপদে সবার জীবনযাত্রার মান বাড়ে। আশপাশের রাজ্য ও দেশগুলোতে যেমন কিছু ঝলমলে শহর, শপিং মল বা ইট-সিমেন্টের বড় অবকাঠামোকে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়, কেরালা তা করেনি। তারা জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিশেষভাবে রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর।
ভারতে মানব উন্নয়ন সূচকে কেরালা প্রথম
স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় মূল বিনিয়োগটা রাজ্য সরকারই করেছে কেরালায় বরাবর। এ দুটোর জন্য বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি মানুষকে। অর্থাৎ রাজ্যের সম্পদ সেখানে কিছু মানুষের কাছে ক্রমে পুঞ্জীভূত হতে না দিয়ে ক্রমাগত বণ্টন ও পুনর্বণ্টনের চেষ্টা করা হয়েছে (বিদ্যমান পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেই যতটা পারা যায়)। এতে ফল হয়েছে এই, ভারতে ৩১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে কেরালা মানব উন্নয়ন সূচকে ২০১৮ সালে যখন প্রথম স্থানে ছিল, গুজরাট তখন ছিল ২১তম।
কেরালা ভূমি সংস্কার দিয়ে শুরু করে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বনেদি গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা এ রকম কিছু করার কথা এখন আর ভাবেনও না। কেরালা কেবল এই একটা কাজ করে গ্রামীণ কৃষিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। কৃষিশ্রমিকদের জন্য পেনশন পর্যন্ত চালু করে তারা। ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সরবরাহ সেখানকার একটা পুরোনো কর্মসূচি। ভারতে যেসব রাজ্যে ক্ষুধার সমস্যা কম, তার মধ্যে পাঞ্জাবের পরই কেরালার অবস্থান। পাঞ্জাব খাদ্য ফলিয়ে এক নম্বরে। আর কেরালা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুই নম্বরে।
কেরালার শিক্ষা মডেল বলা যায় বিশ্বের অন্যতম সেরা। ১৯৫১ সালে রাজ্যটিতে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৭ শতাংশের মতো। এখন তা ৯৪ থেকে ৯৫ শতাংশ। অথচ সর্বভারতীয় গড় ৭০–এর কাছাকাছি।
কেরালার ইরনাকুলাম মেডিকেল কলেজে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ছবি: এএফপিকেরালার ইরনাকুলাম মেডিকেল কলেজে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ছবি: এএফপিকেরালার মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলাম শুরুতে। কেবল একটি তথ্য দিয়ে এর গভীরতা বোঝা যাবে। ভারতজুড়ে মোদি-অমিত শাহ জুটির যখন জয়জয়কার, তখন কেরালার ১৪০ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপি জিতেছে মাত্র একটি আসনে। লোকসভায় এখনো বিজেপি কিছু পায়নি এখানে।
কেরালায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে বামপন্থীদের সঙ্গে মধ্যপন্থীদের। এখন পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বে বামপন্থীরা ক্ষমতায় থাকলেও সেখানে বিরোধী কংগ্রেসও অনেক বছর ক্ষমতায় ছিল।
আরএসএসের মতো শক্তি এখনো সেখানে যে সুবিধা করতে পারেনি, তার বড় এক যোগসূত্র রয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় রাজ্যটির ভালো অবস্থার মধ্যে।
৫৫ শতাংশ হিন্দুর পাশাপাশি প্রায় ৪৫ শতাংশ মুসলমান ও খ্রিষ্টান রয়েছে কেরালায়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা অতি বিরল। এর কারণ খুব সহজ। শাসকদের তরফ থেকে সে ধরনের উসকানি দেওয়া হয় না। কেরালার লোকেরা তাই গর্ব করে বলে, এটা ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ’!
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পুরোনো চার্চ, সেনেগগ, মসজিদগুলোর অক্ষত অবস্থা রাজ্যটির বিকল্প উন্নয়ন মডেলের আরেক প্রতীক। যদি এসব সৌহার্দ্যকে ‘উন্নয়ন’ বলতে মানুষ আদৌ শেখে কোনো দিন।
‘কেরালা মডেল’ নিখুঁত নয় অবশ্যই
হ্যাঁ, কেরালা মডেল নিখুঁত নয়। এখনো সেখানে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থাই কায়েম রয়েছে। আবার ‘গুজরাট মডেল’–এর মতো ঔজ্জ্বল্যও নেই তাতে। মাথাপিছু আয়ের হিসাবে কেরালার মানুষকে ধনীও বলা যায় না। কিন্তু উন্নয়নকে মাথাপিছু গড় আয় আর প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করার চলতি মডেলটি বদলের শক্ত বার্তা দিচ্ছেন পিনারাই বিজয়ন ও তাঁর সহযোগীরা। করোনা মোকাবিলায় সফলতা তাঁদের সব চেষ্টাকে নতুন করে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর মনোযোগে নিয়ে এল আবার।
আলতাফ পারভেজ: গবেষক

প্রধানমন্ত্রীর কাছে অধ্যাপক রাশিদা বেগমের খোলা চিঠি




প্রধানমন্ত্রীর কাছে অধ্যাপক রাশিদা বেগমের খোলা চিঠি


বৈশ্বিক করোনা মহামারীর এই দুঃসময়ে দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থা বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন বিশিষ্ট গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম। তার নিজের ফেসবুকে পোস্ট করা চিঠিটি নিচে তুলে ধরা হলো।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনাকে জানাই সালাম ও শ্রদ্ধা।
আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক। অত্যন্ত সন্মান এবং বিনয়ের সাথে আপনার সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, কিছু তথ্য আপনার কাছে হয়তো বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেটা প্রমাণিত হয় ডাক্তারদের প্রতি আপনার সেদিনের অসোন্তোষের বহিঃপ্রকাশে। ডাক্তারদের শেষ ভরসার জায়গা থেকে অবিশ্বাস আর অসোন্তোষ প্রকাশে ডাক্তারদের মনোবল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
একটি মরণঘাতি এবং সাংঘাতিক ছোঁয়াচে রোগের চিকিৎসা কাছে থেকে দেওয়া ভীষণ মানসিক চাপসম্পন্ন। আইসিইউতে একটি মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চাপই অপরিসীম। এর সঙ্গে যখন যোগ হয় নিজের বেঁচে থাকার চাপ তখন সেই চাপ কত ভারী হতে পারে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল বা চেম্বার (আনডায়াগনোজড ক্যারিয়ারের জন্য) সবক্ষেত্রেই কিছু চাপ থাকে। সমাজের কিছু মানুষের তীব্র নেতিবাচক সমালোচনাতেও মনের ওপর চাপ পরে। তাই এই দুঃসময়ে, মহা দুর্যোগে আপনি একমাত্র অভিভাবক যার অভয়বাণী আর উৎসাহ না পেলে তারা ভেঙে পরে।
দুটো বিষয়ের ব্যাখ্যা
১.
প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ করে কেউ পালায়নি। চেম্বার বন্ধ সংক্রমণ ছড়ানো প্রতিরোধে সহায়তা করেছে। পেশেন্ট থেকে পেশেন্টে, পেশেন্ট থেকে ডাক্তারে এবং ডাক্তার থেকে অজস্র পেশেন্টে। অনেকেই শুধু যে আয় বন্ধ তা নয়, অনেক খরচের বোঝা মাথায় নিয়ে চেম্বার বন্ধ রেখেছে। তাতে পেশেন্টদের স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অসুবিধে হলেও এই দুর্যোগে আহামরি অসুবিধে হচ্ছে না। যখন যার দরকার টেলিফোন, ই মেইল, হোয়াটস অ্যাপ, ম্যাসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কনসাল্ট্যান্সি নিচ্ছে। একজন চিকিৎসক ঘরে বসে যথাথাসম্ভব সাপোর্ট দিচ্ছেন। বুঝদার পেশেন্টরা নিজেরাই ঘর থেকে বের হচ্ছে না। যত কম বের হবে ততই মঙ্গল। চেম্বারে চিকিৎসা দেওয়া হয় না, চিকিৎসাপত্র লেখা হয়। যেটা আমরা এখন বিভিন্নভাবে দিয়ে আসছি। বেশী অসুবিধে যার হবে সে ইমারজেন্সিতে আসবে। তাই সব সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালেও বহির্বিভাগ বন্ধ থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়।
চিকিৎসক রিজার্ভ রাখারও একটি ব্যাপার আছে। সকলকে একসঙ্গে এক্সপোজড করলে চিকিৎসক সঙ্কট হবার আশঙ্কা থাকে। কারণ কেউ অসুস্থ থাকবে, কেউ কোয়ারেন্টিনে থাকবে। সত্য লুকানো কোভিড রোগীদের কারণে অনেক চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী অলরেডি কোয়ারেন্টিনে। তাই বহির্বিভাগ বন্ধ এবং ইনডোরেও ভাগ করে রোস্টার করে ন্যুনতম চিকিৎসক দিয়ে চালানো জরুরি।
২.
পেশেন্ট দ্বারে দ্বারে ঘুরে মৃত্যুবরণ করেছে। ডাক্তারসমাজ সেজন্য যারপরনাই দুঃখিত। কিন্তু এই দ্বারে দ্বারে ঘোরার জন্য দায়ী ব্যবস্থাপকগণ। শুরু থেকে কভিড রোগীর চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো দিকনির্দেশনা ছিল না। একটিমাত্র জায়গায় করোনা টেস্টকে কুক্ষিগত করে রাখার ফলে সন্দেহজনক কোভিড রোগী যখন যে হাসপাতালে গেছে তাদের টেস্টের সুবিধা ছিল না।
ডেজিগনেটেড হাসপাতাল পজিটিভ না হলে নেবে না। কারণ সে নেগেটিভ হলে ওখানে ঢুকে ইনফেক্টেড হতে পারে। অন্য হাসপাতাল পজিটিভ হলে নেবে না কারণ সে অন্য অনেক পেশেন্টদের ইনফেকটেড করতে পারে।
কি প্রাইভেট কি সরকারি হাসপাতালগুলোতে তখনতো দূরের কথা এখনও সব জায়গায় কোনো ট্রায়াজের ব্যবস্থা নেই। টেস্টিং এর ব্যবস্থা নেই। আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন জোনে ভাগ করা নেই। তাহলে সন্দেহভাজন পেশেন্টকে কিভাবে ভর্তি করবে? এখনও বিভিন্ন জায়গায় কোভিড পেশেন্ট তথ্য গোপন করে ঢুকে যাচ্ছে অন্য পেশেন্টের মধ্যে। ফলাফল সব এক্সপোজড স্বাস্থ্যকর্মীর কোয়ারেন্টাইন। ডাক্তার এবং পেশেন্ট উভয়েই এখানে এইসব অব্যবস্থাপনার শিকার। ভাইরাসকে এয়ারপোর্ট দিয়ে অবাধে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই ভাইরাস এখন সারা দেশে। প্রতিরোধের মূল অস্র ভেঙে দিয়ে তার ভার বহন করতে হবে চিকিৎসককে।
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি বহুফাটলবিশিষ্ট ছেড়া প্যান্টের মতো। সামনে জিপারটা একটু ভালো আছে বলে সামনের আব্রুটুকু রক্ষা পেয়েছে এতদিন। আর সেই জিপার হলো ডাক্তার। যে এতদিন কোনোরকমে ঢেকে রেখেছে। এখন করোনার প্রলয়ঙ্কারী তান্ডবে আশপাশ, পিছন সব দেখা যাবে বলে শুধু দুর্ঘটনাই শুনতে হবে। জিপারকে আর দোষ দিয়েন না। যেখানে টারশিয়ারি লেভেল হাসপাতালে আইসিইউ নেই সেখানে ডাক্তারদের আর কি করার আছে। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর নেই, থাকলেও বিকল। চালানোর মতো পর্যাপ্ত এক্সপার্টও নেই।
স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে ভালনারেবল। আক্রান্তদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডাক্তার। অলরেডি ২৯ জন আক্রান্ত তিনজন আইসিইউতে। মারা গেছে একজন হেলথ এসিস্ট্যান্ট। গণমাধ্যমকর্মী, আইনশৃংখলা বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী এবং অন্যান্যদের সাথে স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বিরাট তফাৎ হলো স্বাস্থ্যকর্মীরা ভাইরাসের ডিপোর মধ্যে থাকে, অন্যরা নয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের রিপিটেড এক্সপোজারে ভাইরাল লোড অনেক অনেক বেশী থাকে। তাই এদের ঝুঁকির সাথে অন্য কারো ঝুঁকির তুলনা হবে না। এ দেশের কিছু অবুঝ মানুষের অভিযোগ আর হলুদ সাংবাদিকদের ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লেখায় ডাক্তার সমাজ আজ ভিলেন। মন খারাপ হলেও কেউ পাত্তা না দিয়ে কাজ করে যায়।
কিন্তু তার নিজের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকলে কাজ করবে কেমন করে? যথাযোগ্য পিপিই সকল করোনা রোগীর সেবকদের কাছে যাওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। ডাক্তারদের অনেকেরই যাতায়াত থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির লোকজনও এদের জন্য ঝুঁকিতে। এদের যাতায়াত, থাকা, খাওয়ার সুবিধাদি না দিলে সার্ভিস ব্যহত হতে বাধ্য। সেই সুবিধা না দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রসাশনিক হেড করোনার চিকিৎসারত ডাক্তারদের তার বাসা থেকে দূরের রেস্ট হাউজে থাকতেও বাঁধা দিচ্ছে। সিলেট থেকে করোনায় আক্রান্ত ডাক্তার উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে চাইলে প্রশাসনের কোনো সাহায্য পায়নি। এই ডাক্তারদের সাপোর্ট না দিলে তারা কোথায় যাবে এবং রাষ্ট্রীয় কাজ করবে কিভাবে? ডাক্তার না বাঁচলে কেউ বাঁচবে না। ডাক্তারের নানানরকম খারাপই থাকতে পারে, কিন্তু রোগীর জীবনের জন্য যুদ্ধ করেনা এমন কোনো ডাক্তার নেই।
মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রশাসন থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত আমরা প্রস্তুত, আমরা প্রস্তুত বলে বলে ডাক্তার এবং জনগণের সাথে চরম প্রতারণা করে এসেছে এবং ডাক্তার ও জনগণকে মুখোমুখি দাড় করিয়েছে। কাউকে বাঁচাবার সামর্থ না থাকলেও ডাক্তাররাই শেষ রক্ষাকবচ। তাদের হমকি ধামকি না দিয়ে একটু আপনার প্রার্থনায় রাখুন। কেউ সাজা পাবার মতো কাজ করলে বিভাগীয় শাস্তির যে বিধান আছে সে পাবে। কারণ দর্শানো ছাড়া এই অস্থিতিশীল মুহূর্তে জনসন্মুখে চিকিৎসককে বরখাস্ত করা কতখানি যুক্তিযুক্ত ভেবে দেখতে হবে। এতে সকল চিকিৎসকের মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় কিনা সেটাও চিন্তার বিষয়। একজন দক্ষ ডাক্তার তৈরি হতে বহু সাধনা, বহু ত্যাগ আর বহু দিনের দরকার। ওদেরকে আমরা যেন মনে ও শরীরে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।
তাই ভেতরের খবর জানার জন্য এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু প্রশাসনের লোক নয়, প্রশাসনিক ডাক্তারও নয়, যারা রোগীর চিকিৎসা করে তাদের কথা দয়া করে শুনুন ফ্রন্ট ফাইটারদের একমাত্র এবং শেষ ভরসা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ডাক্তার রোগীকেও বাঁচাতে চায় নিজেও বাঁচতে চায়। এই আপদকালীন সময়ের প্রচন্ড সমন্বয়হীনতায় আপনার হস্তক্ষেপে প্রলয় কমে যাবে নিশ্চয়।
শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় নিবেদিত
আপনার একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক
অধ্যাপক রাশিদা বেগম
চিফ কনসাল্ট্যান্ট, আই সি আর সি
ট্রেজারার, ও জি এস বি
বোর্ড মেম্বার, এশিয়া প্যাসিফিক ইনেশিয়েটিভ অব রিপ্রোডাকশন
মেম্বার, আমেরিকান সোসাইটি অব রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন
মেম্বার ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফার্টিলিটি সোসাইটি
মেম্বার, ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এম্ব্রায়োলজি
মেম্বার, ওয়ার্ল্ড এন্ডোমেট্রিওসিস সোসাইটি।