Monday, April 13, 2020

জীবন বাঁচানো বড়, না জীবিকা বড়?

ফাইল ছবিফাইল ছবিবাংলাদেশে যখন করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার সারা দেশে প্রথম কড়াকড়িভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে জনসাধারণকে আহ্বান জানাল, তখন প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন (এপ্রিল ৪) আমাকে খুব নাড়া দেয়। সংবাদটি ছিল, চাঁদপুরের কোনো এক গ্রামে যখন সরকারি অনুদান নিতে আসা কিছু নারীকে জটলা না করে সামাজিক দূরত্ব রেখে দাঁড়াতে বলা হলো, তখন একজন নারী বলে ওঠেন, ‘সামাজিক দূরত্ব? হেইডা আবার কী? আমরা আইছি চাউল নিতে। চাউলডা পাইলেই চইলা যামু। করোনারে ভয় করি না। আগে খাইয়া বাঁইচ্চা লই।’
এই নারীর কথা আমার কানে আজ অনুরণন করছে যখন সারা দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে সামাজিক দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে শহরের পর শহর তালাবন্দী করতে হচ্ছে, আর লাখ লাখ লোক কর্মহীন হয়ে বাড়িতে বসে আছে। আছে ভয়ে। যত না করোনার জন্য, তার চেয়ে বেশি জীবিকার জন্য, ঘরে অন্ন না থাকার জন্য।
পৃথিবীজুড়ে যে আতঙ্ক সবাইকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তা সামাল দেওয়ার জন্য প্রায় সব দেশই এখন পর্যন্ত যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছে, সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলা তার মধ্যে প্রধান। এর সঙ্গে যেসব এলাকায় ভাইরাসের প্রকোপ বেশি, সেসব এলাকা লকডাউন বা অবরুদ্ধ করা হচ্ছে, যাতে লোকজন যত্রতত্র ঘোরাফেরা না করে বাড়িতে বসে থাকে—খুব জরুরি কাজ না থাকলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে এ ধরনের নিয়মকানুন কোনো না কোনোভাবে চালু হয়েছে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে। জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব দোকানপাট, বড় বড় মল, ছোট–বড় ব্যবসা, সব বন্ধ। আমেরিকার বড় বড় নগরী, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, সান ফ্রান্সিসকোর রাস্তা গাড়িঘোড়াশূন্য, মানুষশূন্য, দেখে মনে হবে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি শহরগুলোকে স্থবির করে ফেলেছে। এসব সম্ভব হয়েছে আতঙ্কের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সচেতনতা, স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ এবং চেষ্টায়। কিন্তু এ সত্ত্বেও এর মধ্যে বহু জায়গায় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। তবু আশার কথা এটাই যে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেখছেন, স্বাস্থ্যবিধান আর শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য অনেক জায়গায় ভাইরাস কম ছড়াচ্ছে।
এ তো গেল ভাইরাস প্রতিরোধের ব্যবস্থা। কিন্তু মাসাধিক কাল ধরে শহরের পর শহর অবরুদ্ধ থাকা আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোটি কোটি লোক কর্মহীন বা ছাঁটাই হবে, এর প্রতিকার কী? এই অবরুদ্ধ পরিবেশ খুব শিগগির যে শেষ হবে, তারও কোনো আভাস এ মুহূর্তে নেই। তাই যুক্তরাষ্ট্র সরকার তড়িঘড়ি আইন পাস করে কর্মহীনদের আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর্থিক সাহায্যের জন্য কয়েক হাজার কোটি ডলারের তহবিল সৃষ্টি করেছে। আশা, এতে অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়বে না। তবু এটা শুধু আশা, ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কত তাড়াতাড়ি এ মহামারি নিয়ন্ত্রণে আসে আর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়।
দুঃখের বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থান আর বাংলাদেশের অবস্থান এক নয়। আজকে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা দমনে সরকারি এবং বেসরকারি যে প্রচেষ্টা এবং সহায়তা আছে, সেটা বাংলাদেশে সম্ভব নয়। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের ৮০ ভাগ জনসাধারণ জীবিকার জন্য দৈনন্দিন কর্মনির্ভর। তা সে গ্রামে বা শহরেই হোক, চাষে হোক, কলকারখানায় হোক বা যানবাহনে। দিনমজুর বা গৃহহীনদের কথা বাদই দিলাম। শ্রমনির্ভর জনগোষ্ঠীকে বেশি দিন অবরুদ্ধ রাখা বা তাদের শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করার নির্দেশ দেওয়া খুব কঠিন কাজ। একে তো ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য কাজের তাগিদ, অন্যদিকে এই ভাইরাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভ্রান্তি।
আমাদের দেশে সাধারণ লোক একটি রোগ সম্পর্কে জানতে পারে সে রোগের দৃশ্যত উপসর্গ বা লক্ষণ থেকে। আগে বসন্ত হলে তা রোগীর গায়ে দেখা দিত, কলেরা হলে তা সঙ্গে সঙ্গে বুঝত, ডেঙ্গু কিংবা ম্যালেরিয়া শরীরে তার লক্ষণ থাকে। কিন্তু এ নতুন রোগ এমনই, যা কেউ আক্রান্ত হলেও অনেকের কোনো লক্ষণ থাকবে না (যাদের বলা হয় উপসর্গবিহীন), অনেকেই থাকবেন অল্প উপসর্গ নিয়ে, যা দেখে কেউ তাকে ভাইরাসে আক্রান্ত বলে মনে করবেন না, ততক্ষণ তাঁর কোনো পরীক্ষাও হবে না। ফল এই দাঁড়ায় যে আমাদের এই বিরাট জনগোষ্ঠীকে এই ভাইরাস সম্পর্কে ব্যাপকভাবে শিক্ষিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এ শিক্ষা দেওয়ার যে সময় তা দিতে দিতে আমাদের যে দুটো জিনিস সামলাতে হবে তা হচ্ছে, ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সার্বিক জনস্বাস্থ্য প্রস্তুতি, পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং হাসপাতাল প্রস্তুতি। এর সঙ্গে প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে কর্মহীনদের জন্য আর্থিক সাহায্য, গ্রামে গ্রামে ত্রাণ ব্যবস্থা আর বহুলভাবে কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প প্রণয়ন।
সরকার এর মধ্যে কৃষিকাজ, পোশাক, এবং অন্যান্য শিল্পের জন্য তহবিল ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কথা থেকে যায়। কত দ্রুত এ সাহায্য প্রকৃত ব্যক্তি বা প্রকৃত প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছাবে। এ সাহায্য পেতে মানুষের কত আমলাতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। আর এ সাহায্য কি আদৌ পৌঁছাবে চাঁদপুরের সেই নারীর কাছে, যিনি সরকারি অনুদান নিতে সামাজিক দূরত্বের তোয়াক্কা করেন না, যাঁর কাছে পেটের ক্ষুধানিবৃত্তি করোনাভাইরাসের চেয়ে বেশি ভয়ংকর? তাই তাঁদের কাছে জীবিকা প্রয়োজন, কারণ বেঁচে থাকতে এটাও দরকার।
সরকারের কাছে এখন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষকে এই ভয়াবহ ভাইরাস থেকে বাঁচাতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে তার জীবিকাকেও বাঁচাতে হবে। আশা করছি, আমরা দুটোই পারব।
জিয়াউদ্দিন চৌধুরী: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

No comments:

Post a Comment