
ফাইল ছবি
রাজধানীসহ
সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলোর চালকদের অধিকাংশরই বৈধ
লাইসেন্স নেই। এদের অনেকে নকল লাইসেন্স বা ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে গাড়ি
চালাচ্ছেন। হাল্কা যানবাহনের চেয়ে ভারী পরিবহনের চালকদের লাইসেন্স সমস্যা
গুরুতর। অবৈধ ও অদক্ষ চালক সমস্যা সড়কে নৈরাজ্য ও দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে
চিহ্নিত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট
সূত্রগুলো জানায়, সড়ক-মহাসড়কগুলো এখন বেপরোয়া যান ও অদক্ষ চালকদের দখলে।
বেসরকারি পরিসংখ্যান মতে, সারাদেশে যানবাহনের নিয়মিত-অনিয়মিত চালকের সংখ্যা
৭০ লাখের বেশি। এর মধ্যে বিআরটিএর লাইসেন্স আছে ২০ লাখেরও কম। অবশিষ্ট
প্রায় ৫০ লাখ চালক অবৈধ ও অদক্ষ। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের
(বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ মুহূর্তে চলাচল করা বাস, মিনিবাস ও
হিউম্যান হলারসহ মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৩১ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৯। এর
বিপরীতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক আছে প্রায় ২০ লাখ। আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ
সমিতির হিসাবে বাংলাদেশে ট্রাক-বাস-মিনিবাসসহ যানবাহন চলছে ৪০ লাখের ওপরে।
তাদের বক্তব্য, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিবন্ধিত গাড়ির হিসাব দেশের কোনো সংস্থার
কাছেই নেই। ৪০ লক্ষাধিক যানবাহন রাস্তায় চালাতে প্রতিটি গাড়ির জন্য একাধিক
চালক প্রয়োজন। সেই হিসাবে এসব যানবাহন চালাতে অন্তত ৮০ লাখ চালক প্রয়োজন।
বৈধ ২০ লাখের মধ্যে অনেকেই মারা গেছে। আবার অনেকে এখন আর গাড়ি চালান না।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও জানিয়েছেন, দেশে নিবন্ধিত
যানবাহনের তুলনায় লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা অর্ধেক। দেশে মধ্যম ও ভারী এ
দুই শ্রেণির মোটরযানের ক্ষেত্রেই চালক সংকটের কথা পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও
বিআরটিএর কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে।
গাড়ি ও বৈধ চালকের এ অসামঞ্জস্য অনুপাত সামনে রেখেই সীমিত পরিসরে নতুন সড়ক
আইন প্রয়োগ শুরু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গতকাল
থেকে এর প্রভাব পড়েছে সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কে। যানবাহন চলাচল কমে এসেছে,
কয়েকটি জেলায় চালক-শ্রমিকরা পরিবহন ধর্মঘট শুরু করেছে।
বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগরীতে ২০ লাখ নিবন্ধিত মোটরযানের
বিপরীতে চালক রয়েছেন মাত্র ১৪ লাখ। একইভাবে লক্ষাধিক ভারী মোটরযানের
বিপরীতে এগুলোর লাইসেন্সধারী চালক রয়েছেন মাত্র ২১ হাজার। অন্যদিকে সাড়ে ৫
লাখ হাল্কা মোটরযানের বিপরীতে লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ৪ লাখের সামান্য
বেশি।
দেখা যায়,
রাস্তায় অনেক গাড়িই চালাচ্ছে হেলপাররা। যাদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ১৮
বছরের মধ্যে। অথচ আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে একজন পেশাদার চালকের
বয়স হতে হয় কমপক্ষে ২০ বছর। যার কোনোটি না থাকা সত্ত্বেও গাড়িভর্তি যাত্রী
নিয়ে চলছে এসব কিশোর চালক। এরা জানিয়েছে, পুলিশকে টাকা দিলেই বিনা বাধায়
তারা সড়কে গাড়ি চালাতে পারে। দূরপাল্লার গাড়িগুলোর ১ শতাংশ বিআরটিসি
নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ৯৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি মালিকপক্ষ।
বিআরটিএর
বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির আবেদনের
পরিপ্রেক্ষিতে এবং পরীক্ষার পর চালককে প্রথমে হালকা মোটরযানের (আড়াই হাজার
কেজির কম ওজন) পেশাদার লাইসেন্স দেওয়া হয়। তিন বছর হালকা মোটরযান চালানোর
পর একজন চালক মধ্যম শ্রেণির মোটরযান (আড়াই থেকে সাড়ে ৬ হাজার কেজি) চালানোর
লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেন। একইভাবে তিন বছর মধ্যম মোটরযান চালানোর
পর চালককে ভারী মোটরযান (সাড়ে ৬ হাজার কেজির বেশি) চালানোর জন্য পেশাদার
লাইসেন্স দেওয়া হয়। বাস-ট্রাক চালাতে প্রয়োজন পড়ে ভারী শ্রেণির মোটরযান
চালানোর লাইসেন্স।
১৯৮৩ সালের
মোটরযান অধ্যাদেশে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর শাস্তি ছিল ৫০০ টাকা জরিমানা
বা চার মাসের জেল কিংবা উভয় দণ্ড। অন্যদিকে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া সড়ক
পরিবহন আইন ২০১৮-এ জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ বেড়েছে কয়েক গুণ। এক্ষেত্রে
লাইসেন্সবিহীন চালককে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের জেল
কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ
যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতা মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাস্তবে বৈধ-অবৈধ
গাড়ি মিলিয়ে সারা দেশে ৪০ লাখের বেশি গাড়ির পেছনে নিয়মিত অনিয়মিত মিলিয়ে
চালক রয়েছে ৭০ লাখ। তাদের মধ্যে বিআরটিএ এর লাইসেন্স আছে সর্বোচ্চ ১৮ লাখ।
বাকিরা অবৈধভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ (নিবন্ধন বাতিল) ও অননুমোদিত
বাস, লেগুনা, নসিমন-করিমন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ দেশীয় প্রযুক্তিতে
তৈরি গাড়ি সারা দেশে যাত্রী পরিবহন করছে। এসব চালকের কোনো লাইসেন্স নেই।
চালক সংকট সম্পর্কে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার
এনায়েত উল্লাহ বলেন, চালক সংকট সমাধানের জন্য আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা
করছি। মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিআরটিএর
পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, আমরা ক্র্যাশ
প্রোগ্রামের মাধ্যমে সারা দেশে ছয় লাখ ভারী চালক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা
যেভাবে পরিকল্পনা করেছি তাতে অবৈধ চালক সমস্যার সমাধান হবে আশা করি। তিনি
বলেন, আমরা চালক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। পেশাদার লাইসেন্স
নবায়নের ক্ষেত্রে আমরা বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। আমরা
এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমও জোরদার করেছি। আগে যেখানে পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট
ছিলেন, সেখানে এখন রয়েছেন ১০ জন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি)
কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, সামান্য জরিমানা দিয়েই সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর
বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে এই আইন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে
লাইসেন্সহীন চালক থাকবে না আর। দূর হয়ে যাবে সড়কের নৈরাজ্যও।
ইত্তেফাক/এএম

No comments:
Post a Comment