জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, দু'দিন ধরে আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়নি- এটি নিয়ে স্বস্তির কিছু নেই। কারণ নমুনা পরীক্ষার পরিধি তো খুব বেশি নয়। দু'দিনে সন্দেহভাজন দেড়শর মতো ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। ১৬ থেকে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র দেড়শ জনকে পরীক্ষার আওতায় এনে যদি বলা হয়, সংক্রমিত কাউকে পাওয়া যায়নি, তা সঠিক হবে না। আবার হটলাইনের যেসব নম্বর দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে ঢোকাই যায় না। আমি নিজেও চেষ্টা করে দেখেছি। কিন্তু হটলাইনের সংযোগ পাইনি। তাহলে নমুনা কীভাবে সংগ্রহ হবে? যদি প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের নমুনা পরীক্ষা করে বলা হতো; আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি, তাহলে স্বস্তি পাওয়া যেত। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না।
আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত না হওয়ার কারণে সতর্কতা এড়িয়ে না চলার আহ্বান জানিয়ে ডা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে করোনাভাইরাসের 'পিকটাইম'। সংক্রমণ কোন পর্যায়ে ছড়াবে তা এই সময়ের মধ্যেই প্রকাশ্যে আসবে। সুতরাং এই সময় পর্যন্ত সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কোয়ারেন্টাইন শর্ত পালনের পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে সবাইকে চলাফেরা করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, হটলাইনে আট লাখের বেশি মানুষ ফোন করেছেন। তাদের মধ্যে মাত্র এক হাজারের কিছু বেশি মানুষকে তারা পরীক্ষার আওতায় আনতে পেরেছে। এর মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হয়, আট লাখ মানুষ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। সর্বজনীন পরীক্ষার সুযোগ থাকলে এসব মানুষ নিজের অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষা করতেন। অর্থাৎ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়ে একটি কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা চলছে। আইইডিসিআর মনে করলে তাহলেই সন্দেহভাজন ব্যক্তি পরীক্ষার আওতায় আসবেন। আর তারা মনে না করলে আসবে না। এই প্রক্রিয়ায় তো এই ভাইরাস প্রতিরোধ করা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুস্পষ্ট করে বলেছে, এই ভাইরাস প্রতিরোধের মূলমন্ত্র পরীক্ষা। অর্থাৎ, যতসংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায় আনা যাবে, ততই ভাইরাস প্রতিরোধে বেশি সফলতা আসবে। কারণ পরীক্ষা করে আক্রান্ত কাউকে পাওয়া গেলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে আইসোলেশনে নিতে হবে। আর আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু সেটি তো হচ্ছে না।
আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত না হওয়ার মধ্যে কেউ স্বস্তি খুঁজলে সেটি অজ্ঞতার শামিল হবে বলেও মনে করেন ডা. রশিদ-ই মাহবুব। তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত কাউকে খুঁজে না পেয়ে সরকার যদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তাহলে সেটি বড় বোকামি হবে। তাই সংশ্নিষ্টদের প্রতি আহ্বান থাকবে, পরীক্ষা নিয়ে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ছেড়ে এটিকে সর্বজনীন করুন। যত বেশি মানুষ পরীক্ষার আওতায় আসবে, ততই মঙ্গল হবে। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হলে তাকে আইসোলেশনে এবং তার সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত কোয়ারেন্টাইনে নিতে পারলেই রোগটি থেকে মুক্তি মিলবে। তাই রোগী না পেলে স্বস্তিতে না থেকে জোরালো পদক্ষেপ নিন।
ভাইরোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, অধিক সংক্রমণের শিকার দেশগুলোতেও প্রথমে দুই থেকে তিনজনের দেহে করোনার সংক্রমণ দেখা দেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ, প্রথমে দু-একজন ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা আক্রান্ত হন। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রতিবেশী, স্বজন থেকে শুরু করে সর্বত্র বিস্তার ঘটে। এই ভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পেতে ১৪ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত সময় লাগে। কারও কারও ক্ষেত্রে আরও আগেভাগে তা প্রকাশ পায়। সাধারণ সর্দি-কাশি ও ফ্লুর সঙ্গে এর মিল থাকার কারণে পরীক্ষা না করে কেবল লক্ষণ-উপসর্গ দেখে এই ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশে এর পরীক্ষা-নিরীক্ষা অত্যন্ত সীমিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও এর ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের দেশগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করেছে। একজনেরও দেহে শনাক্ত না হওয়া দেশ স্তর ১-এ থাকবে। বিদেশফেরত ব্যক্তির শনাক্ত ও তাদের মাধ্যমে আরও দু-একজনের দেহে সংক্রমিত হওয়া দেশ স্তর ২-এ থাকবে। নির্দিষ্ট কিছু এলাকার বা নির্দিষ্ট কিছু মানুষ সংক্রমিত হলে তা স্তর ৩-এ থাকবে। আর সংক্রমণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা স্তর ৪-এর আওতায় পড়বে। সে হিসেবে দেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ওই দিন থেকে বাংলাদেশ স্তর ২-এ পড়ে। এর আগ পর্যন্ত স্তর ১-এ ছিল। কিন্তু মিরপুরে আক্রান্ত ওই ব্যক্তির মৃত্যু এবং তার মাধ্যমে হাসপাতালের আরও একজন চিকিৎসক সংক্রমিত হয়েছেন। একই সঙ্গে ওই বক্তির প্রতিবেশী আরও একজনের একই উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাগ করা স্তর ৩ হিসেবে বলা যায়। গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশে ৪৮ জন আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রশংসনীয়। স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগেভাগেই ছুটি ঘোষণা এবং সরকারি-বেসরকারি সব অফিস টানা ১০ দিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী কাজ করছে। জনবহুল দেশটির চেহারা সত্যিই অচেনা লাগছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ সত্যিই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। বিদেশফেরত ব্যক্তিকে শুরুতেই কোয়ারেন্টাইন করে রাখা গেলে পরিস্থিতি এমন হতো না। সেটি করতে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। আবার বাসাবাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে পাঠিয়ে সেটি নিশ্চিত করতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে নামিয়ে কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হচ্ছে। কিন্তু বিদেশফেরত ঝুঁকিপূর্ণ ওইসব ব্যক্তির নির্ধারিত ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সবাইকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আওতায়ও আনা যাচ্ছে না। তাহলে আমরা তো ঝুঁকির মধ্যেই থেকে গেলাম। আবার হাসপাতালে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যারা চিকিৎসা দেবেন, সেই চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই দেওয়া হয়নি। এই পিপিই নিয়ে কর্তাব্যক্তিরা এলোমেলো মন্তব্য ও আদেশ জারি করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছেন।
ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী আরও বলেন, সীমিত সংখ্যক মানুষের মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে করোনামুক্ত হয়েছে- এটি বলার সুযোগ নেই। এর পরিধি বাড়াতে হবে। অন্যথায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বিষয়টি ছেলেখেলা নয়, এটি স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের মনে রাখতে হবে। সুতরাং তাদের প্রতি আহ্বান জানাই, খামখেয়ালি না করে হটলাইনের সংখ্যা বাড়িয়ে নমুনা পরীক্ষার পরিসর বিস্তৃত করুন। যেসব মানুষ পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা মনে করবে, তাদের সবাইকে করতে হবে। তাহলেই আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হবে। ওই ব্যক্তি ও তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইনে যত দ্রুত নেওয়া যাবে, তত দ্রুত আমরা এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে পারব। সুতরাং নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় বিপদ বাড়তে পারে।
করোনা প্রতিরোধ-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সমন্বয়ক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, গত দু'দিনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি- এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। আক্রান্তদের মধ্যে আরও চারজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ নিয়ে মোট ১৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। আর যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের সবার বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছরের ওপরে এবং সবার ডায়াবেটিস, কিডনি, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। সংক্রমণের যে সময়সীমার কথা বলা হয়েছে, সেই পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন থাকলে আমরা অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত হতে পারব। তাই সবার প্রতি আহ্বান থাকবে- হোম কোয়ারেন্টাইন ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা প্রতিরোধে যেসব সতর্কতামূলক বার্তা প্রচার করছে, সেগুলো মেনে চলুন। তাহলেই আমরা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এই মহামারির হাত থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পারব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাজধানীসহ সারাদেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। কয়েকটি স্থানে শুরুও হয়েছে। বাকিগুলো আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চালু হবে। ভেন্টিলেশন ও আইসিইউ সুবিধার পরিধিও বাড়ানো হচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে দু'দিন ধরে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত না হওয়া স্বস্তির খবর। এই ভাইরাসটি সংক্রমণের সময়সীমা পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকলে ঝুঁকিমুক্ত হতে পারব। তবে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

No comments:
Post a Comment