Saturday, March 28, 2020

এই বিপদে আমাদের তারুণ্য


কভিড-১৯ ভাইরাসের এখনও তেমন কোনো ভ্যাকসিন বা প্রতিরোধক আবিস্কার না হওয়ায় এর থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা আর সচেতনতা। আর এ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতায় এগিয়ে এসেছে তরুণরা। কার্যকরী হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে বিতরণ করার পাশাপাশি গড়ে তুলছে সচেতনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের রসায়ন বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে তা বিতরণ করে পাশে দাঁড়িয়েছেন মানুষের। এমন উদ্যোগী আর আশাবাদী তরুণদের গল্প শোনাচ্ছেন  মুনতাসির রশিদ খান


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষায় নিজস্ব অর্থায়নে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার ও ফার্মেসি অনুষদের শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হল, অনুষদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারে প্রাথমিকভাবে জীবাণুনাশকটি তৈরি করা হয়। এ কাজে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করেন ফার্মেসি অনুষদের শিক্ষকরা। ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বলেন, 'বিভাগের নিজস্ব অর্থায়নে শুরুতে ৫০০ বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও পরে এটি বেড়ে এক হাজার বোতলে গিয়ে ঠেকে। আমাদের প্রত্যাশা, মজুত থাকা কেমিক্যাল দিয়ে আড়াই হাজার বোতল পর্যন্ত আমরা তৈরি করতে পারব।' এ উদ্যোগের নেতৃত্বে থাকা বিভাগের শিক্ষক মো. আবদুল মুহিত বলেন, 'ছাত্রদের নিয়ে আমরা এমন একটা কাজ করতে পারায় মনে অন্যরকম এক প্রশান্তি বিরাজ করছে। চাহিদার তুলনায় এটি অপ্রতুল হলেও আমরা আরও ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছি।'

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
করোনাভাইরাসের ভয় ছড়িয়ে পড়ার পর বাজারে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সংকট দেখা দেয়। এই সংকটে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিকভাবে তারা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের চাহিদা মেটাতে তৈরি করেন হ্যান্ড স্যানিটাইজার। তাদের নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরি এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার বুয়েটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। বুয়েটের রসায়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. শাখাওয়াৎ এইচ ফিরোজ বলেন, 'করোনাভাইরাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। এই দেখে ভাবলাম, কিছু একটা করা দরকার। তারপর সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলি। তাৎক্ষণিকভাবে আমার তরুণ সহকর্মী আয়েশা শারমীন, শারমীন নিশাত, আবু বিন ইমরান, চঞ্চল কুমার রায়, ইলিয়াস হোসেন, আইয়ুব আলী, মাহবুব আলমদের নিয়ে কাজ শুরু করি। আর রসায়ন ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়ে আমাদের কাজকে আরও সহজ করে দেয়। প্রথম দিনেই আমরা হ্যান্ড স্যানিটাইজারের একটি ফর্মুলেশন তৈরি করি। আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করে সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ফোরাম-৮৬।'

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
১৭ মার্চ, দরিদ্র জনসাধারণকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে সচেতন করার লক্ষ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তৈরি করেন হ্যান্ড স্যানিটাইজার। এসব স্যানিটাইজার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিতরণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের উদ্যোগে তৈরি করা হয় এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার। ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার ধ্বংসে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম এই স্যানিটাইজার নিয়ে জানতে চাইলে রসায়ন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. নূরল আবছার বলেন, 'নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা এ কাজের উদ্যোগ নিয়েছি। তবে পর্যাপ্ত অর্থের জোগান না থাকায় আমরা স্বল্প পরিসরে এটি তৈরি করে ক্যাম্পাসে অবস্থানরত বিভিন্ন দরিদ্র মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করেছি। আর্থিকভাবে প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে বাজারে সরবরাহ করার বিষয়েও চেষ্টা করব।' জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তৈরি এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার তারা বাজারজাত করতে চায় কম মূল্যে। এতে ১০০ মিলি হ্যান্ড স্যানিটাইজারের দাম পড়বে মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকা।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
করোনায় সংক্রমিত কেউ বোতলে আবদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্পর্শ এবং ব্যবহার করলে পরবর্তী সময়ে ওই বোতল ব্যবহারকারী সবার শরীরের ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রকোপ থেকে যায়। আর এই ভাবনা থেকেই জীবাণুনাশক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির অটো হ্যান্ড স্যানিটাইজার ডিসপেন্সার তৈরি করে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা চুয়েটের রোবট গবেষণাভিত্তিক সংগঠন রোবো মেকাট্রনিক্স অ্যাসোসিয়েশন। এটি তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে পরীক্ষামূলকভাবে উদ্ভাবিত প্রথম স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার মেশিন। সফলভাবে উদ্ভাবিত এই মেশিন চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ের ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পাশে স্থাপন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত প্রস্তুত প্রণালি ব্যবহার করে প্রাথমিকভাবে মেশিনে দুই লিটার তরল স্যানিটাইজার দেওয়া হয়েছে। পরে বৃহৎ পরিসরের স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার মেশিন বসানোর কথা ভাবছে সংগঠনটি। এই ব্যতিক্রমী মেশিনের উদ্ভাবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংগঠনের সদস্য হাসিবুল ইসলাম সোহাগ বলেন, 'সাধারণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারে একটা ঝুঁকি থেকে যায়। আগে ব্যবহূত মানুষটি করোনাভাইরাসের সংক্রমিত থাকলে, পরে সেই স্যানিটাইজার অন্য কেউ ব্যবহার করলে তারও সংক্রমণ হতে পারে। এ সমস্যা সমাধানেই আমাদের এই প্রচেষ্টা।' সাধারণ জনগণের কথা মাথায় রেখে এবং তাদের ব্যবহারের সুবিধার্থে এটি খুব কার্যকর।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তৈরি করেছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। ১১ মার্চ থেকে শিক্ষার্থীরা কাজ শুরু করেন। এই নিয়ে জানতে চাইলে ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান জাকির বলেন, '১৬ মার্চ রাত ৩টা পর্যন্ত আমরা কাজ করেছি। অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি করেছি এক হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার। সেগুলো ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। আর আমাদের এই হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির সব খরচ দিয়েছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র সাজেদুর রহমান।'

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ ১৭ মার্চ করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে। বিভাগের শিক্ষক ড. মো. আমিনুল হক বলেন, 'আমরা আপাতত বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করেছি। প্রশাসনের সহযোগিতা পেলে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের মাঝেও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করব।'

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের কৃষি রসায়ন বিভাগের উদ্যোগে তৈরি করা হ্যান্ড স্যানিটাইজার। বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ আনুষ্ঠানিকভাবে বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করে বলেন, 'প্রাথমিকভাবে ১০০ মিলি লিটারের এক হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও সামনে সেটা আরও বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। কৃষি রসায়ন বিভাগের এই প্রচেষ্টা ক্যাম্পাসে আশা জাগিয়েছে।'

এ ছাড়া বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে সাধারণের মাঝে বিতরণ করে। এই মহামারি আমাদের যেমন নানা ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে, তেমনি তরুণদের এমন মানবতাবাদী অনন্য নিদর্শন আমাদের বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। এ স্বপ্নই যে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায় পৃথিবী জয়ের পথে।

No comments:

Post a Comment