কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় জরুরি হয়ে পড়া ভেন্টিলেটরের চাহিদা ও জোগানে রয়েছে বিস্তর ফারাক। ছবি: রয়টার্সনতুন
করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারিতে চিকিৎসা সরঞ্জামের
অপ্রতুলতাই সবচেয়ে বেশি চোখে বিঁধছে। নিরাপত্তার জন্য মাস্ক থেকে শুরু করে
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা
ভেন্টিলেটরের এক ভয়াবহ স্বল্পতার অভিজ্ঞতা নিচ্ছে বিশ্ব। এমনকি
যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোও এই সংকটকালে ভেন্টিলেটরের মতো জরুরি চিকিৎসা
সরঞ্জামের সরবরাহ দিতে হিমশিম খাচ্ছে।নতুন করোনাভাইরাসের সঙ্গে মানুষের আগে পরিচয় ছিল না। ফলে এর প্রতিষেধক তৈরি থেকে শুরু করে আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসায় কোন ওষুধ ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে ভেন্টিলেটরের মতো জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের জোগানে এমন ঘাটতি—সত্যিই বিস্ময়কর। এত এত বড় ওষুধ কোম্পানি, এত শক্তিধর সব সরকার তবে কী করল?
প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার আগে ভেন্টিলেটরের স্বল্পতাটি ঠিক কোন মাত্রার, তার হদিস নেওয়া যাক। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে জোগানের তুলনায় ভেন্টিলেটরের চাহিদা দশ গুণ। অর্থাৎ ভেন্টিলেটর প্রয়োজন এমন দশজন রোগীর বিপরীতে রয়েছে মাত্র একটি করে ভেন্টিলেটর। যুক্তরাষ্ট্রেরই যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে অন্য দেশগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমেয়।
কিন্তু এই সংকট কেন তৈরি হলো? এর উত্তর খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই তাকানো যাক। দেশটির বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, ১৩ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক দল জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মার্কিন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় একটি পরিকল্পনার কথা জানান। ঝুঁকিটি ছিল ‘ভেন্টিলেটরের স্বল্পতা’। ওই কর্মকর্তাদের ভাষ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে সে সময় যত ভেন্টিলেটর ছিল, তা বড় ধরনের সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়। এ কারণে তাঁরা সহজে বহন করা যায় ও কম খরচে ভেন্টিলেটর উৎপাদনের একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। তাঁদের সেই প্রস্তাব পাস হয়েছিল, হয়েছিল অর্থ বরাদ্দও। ‘প্রজেক্ট অরা’ নামের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ নাগাদ। লক্ষ্য ভেন্টিলেটরের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা এবং বাজারমূল্য ৩ হাজার ডলারের নিচে নামিয়ে আনা।
ফেডারেল চুক্তি সইয়ের পর সে অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছিল। নতুন এই ভেন্টিলেটর তৈরির দায়িত্ব পায় ‘নিউপোর্ট’ নামের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের তৈরি ভেন্টিলেটর উৎপাদনের জন্য ছাড়পত্রও পায়। কিন্তু তারপরই ওই ছোট প্রতিষ্ঠানকে কিনে নেয় কোভিডিয়েন নামের বড় একটি প্রতিষ্ঠান। তারা প্রকল্পটি থেকে মুনাফা নিয়ে সন্দিহান ছিল। বহু চিকিৎসা সরঞ্জামের উৎপাদক ওই প্রতিষ্ঠান জানায়, কম মূল্যের ভেন্টিলেটরের উৎপাদন এই মুহূর্তে ‘টপ প্রায়োরিটি’ নয়। ২০১২ সালে নিউপোর্টের কর্মকর্তারা মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের তৈরি ভেন্টিলেটর বাজারে বিক্রির অনুমোদন চায়। কিন্তু বাদ সাধে কোভিডিয়েন। তারা জানায়, বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে তারা ডিভাইসটির দাম আরও বেশি রাখতে চায়। একই সঙ্গে তারা সরকারের কাছ থেকে আরও অর্থ বরাদ্দ চায়। ফেডারেল সরকার শেষ পর্যন্ত ১৪ লাখ ডলার বরাদ্দ দিলেও কাজ হয়নি। ওই প্রকল্পের আওতায় আজ পর্যন্ত কোনো ভেন্টিলেটর উৎপাদিত হয়নি। পরে ২০১৪ সালে ফেডারেল সরকার অন্য একটি কোম্পানির সঙ্গে একই বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হয়, যাদের তৈরি ভেন্টিলেটর গত বছর অনুমোদন পেলেও তারা এখনো কোনো ভেন্টিলেটর বাজারে সরবরাহ করতে পারেনি।
বৈশ্বিক ভেন্টিলেটর বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করত কোভিডিয়েন। নিউপোর্টের তৈরি কম দামের ভেন্টিলেটর বাজারে এলে তাদের বাজার হুমকিতে পড়তে পারত। এ কারণেই তারা নিউপোর্টকে ১০ কোটি ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউপোর্টকে কিনেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, প্রচলিত ভেন্টিলেটরের বাজারকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে তারা জীবন রক্ষাকারী একটি চিকিৎসা সরঞ্জামের উৎপাদন স্থগিত করে দেয়। যেকোনো মূল্যে স্বল্পমূল্যের ভেন্টিলেটরের উৎপাদন ঠেকানোই যেন তাদের লক্ষ্য ছিল। এমনকি অন্য কেউ যেন এতে না ঢুকতে পারে, সে জন্য তারা ২০১৪ সাল পর্যন্ত একটি ভেন্টিলেটর উৎপাদন না করেও মার্কিন ফেডারেল সরকারের সঙ্গে চুক্তিতে থেকে গিয়েছিল।
করপোরেট পুঁজির অতি মুনাফালোভী চরিত্র এমন বহু উদ্যোগকে গোড়াতেই শেষ করে দিচ্ছে। এই লোভ যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশকেই অন্তত ছয় বছর পিছিয়ে দিয়েছে, যা না হলে এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো এতটা বিপাকে পড়তে হতো না। মুনাফার প্রতি এই লোভ এমন এক ভয়াবহ ব্যর্থতার জন্ম দিয়েছে, যার ভার এখন সবাইকে বহন করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় প্রশাসন ভেন্টিলেটরের জোগান নিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। ভবিষ্যৎ জোগানের কথা ভেবে নির্ঘুম হতে হচ্ছে সৎ প্রশাসক মাত্রই। জার্মানির হেসে প্রদেশের অর্থমন্ত্রী হেসে শেফারের মৃত্যু (যাকে আত্মহত্যা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে) কিংবা নেদারল্যান্ডসের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ক্লান্তিজনিত পদত্যাগ—এই সবই অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা ও পুঁজির এক অবধারিত ফল হয়ে সামনে চলে এসেছে।
এখন চিকিৎসকদের আক্ষরিক অর্থেই এ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে যে তাঁরা কার শ্বাসপ্রশ্বাসে সহায়তা দেবেন, কাকে দেবেন না। এটি চিকিৎসা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি করছে, যা হয়তো দুর্যোগ কেটে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন তাঁদের বহন করতে হবে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে জানানো হয়, মার্কিন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য অন্তত সাড়ে ৯ লাখ ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন পড়তে পারে। অথচ তাদের হাতে রয়েছে মাত্র দুই লাখ ভেন্টিলেটর।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বা চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের বিষয়টি বেসরকারি খাতে একেবারে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছেড়ে দেওয়ার বড় খেসারত এখন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও মুক্তবাজারের অনুরাগীরা এটা ভেবে দেখেনি যে পুঁজিপতিরা সেখানেই বিনিয়োগ করেন, যেখান থেকে মুনাফা বেশি আসে। এমনকি তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম কাঙ্ক্ষিত মানে রাখতে কৃত্রিম সংকট তৈরি থেকে শুরু করে নানা খেলাও খেলতে পারে। জনগণের জীবনের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া রাষ্ট্রের চেয়ে একটি কোম্পানির লক্ষ্য সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষের ভোটে বা সমর্থনে গঠিত সরকারের দায়—জনগণের সুরক্ষা। আর কোম্পানির লক্ষ্য বা দায় যা-ই বলা হোক একটিই—আরও বেশি মুনাফা।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) সাবেক পরিচালক ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ থমাস আর ফ্রিডেন বলেন, ‘আমরা সংকটটি এখন বুঝতে পারছি। হয়তো এটি আমরা ঠিকঠাক মোকাবিলা করতে পারব। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই আমরা আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী (ভেন্টিলেটরের) সরবরাহ পাব না।’
থমাস ফ্রিডেনের এ বক্তব্য অবশ্যই আশাজাগানিয়া। কিন্তু সত্য হচ্ছে, সার্স, মার্স, বার্ড ফ্লু ও সোয়াইন ফ্লু একইভাবে বৈশ্বিক মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরির পরই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সহজে বহনক্ষম ও স্বল্পমূল্যের ভেন্টিলেটর উৎপাদনের এ প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। একই ধরনের নানা প্রকল্প ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও নেওয়া হয়। সে প্রকল্পগুলোর ভাগ্যে কী হয়েছে, তার অনুসন্ধান না করে শুধু এখনকার পরিণতির দিকে তাকালেই হতাশ হতে হয়। কারণ, বিগত ওই মহামারিগুলোও বৈশ্বিক পুঁজি কাঠামো ও সরকারগুলোকে সচেতন করার মতো যথেষ্ট ছিল না। এরই ফল হচ্ছে আজকের চিকিৎসা সরঞ্জামের অপ্রতুলতা।
এই যে পরিস্থিতি, এর মধ্যেও মুনাফা করে নেওয়া লোকের সংখ্যা তো কম নয়। বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলেই একশ্রেণির ব্যবসায়ী মানুষের সংকটের সুযোগ নিচ্ছে। ভারতেই যেমন ভেন্টিলেটরের দাম ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নজরদারিও সেখানে কিছু করতে পারছে না। দিল্লির প্রতিষ্ঠান মেডক্যাম এন্টারপ্রাইজের বিজনেস হেড কমলেশ মৌর্জ স্বীকার করেছেন, চাহিদা বেশি হওয়ায় তাঁরা ডিভাইসটির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দুর্যোগের এই কালে একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অতি মুনাফালোভী ঘৃণ্য আচরণ।
শুধু ভেন্টিলেটর কেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা পোশাক থেকে শুরু করে মাস্ক প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে সংকট। প্রয়োজনের তুলনায় এসব জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ ভীষণ কম। যাও আছে, তার বাজার নিয়ন্ত্রণে বহু জায়গাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ এই মহাদুর্যোগের সময় নিয়ন্ত্রণহীন বাজারব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি প্রত্যক্ষ করেছে। একেকটি মাস্ক দেশীয় বাজারেই চড়া দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে সব ধরনের জীবাণুনাশক পেতে সাধারণ মানুষকে ছুটতে হয়েছে এ দরজা থেকে ও দরজায়। কোথাও পেলেও তার দাম অনেকেরই পিলে চমকে দিয়েছে। নতুন করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারি গোটা বিশ্বের সামনে মুক্তবাজার অর্থনীতির কু-দিকটি উন্মোচন করে দিয়েছে। এটি জানিয়ে দিচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতের মতো একটি বিষয়কে লাগামছাড়া পুঁজির ঘোড়ায় সওয়ার করানো যায় না। এই সংকট আমাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক মডেলটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বলছে। এই সংকট পার হয়েও উপলব্ধিটি থাকলেই হয়। Protham Alo
No comments:
Post a Comment