বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের মহামারীর সময় নজরুলের একটি
কবিতা মনে আশ্বাস জোগায়- ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর/ধ্বংস নূতন
সৃজন-বেদন!/আসছে নবীন- জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!’
ধ্বংসই নতুন জীবন ও নতুন সৃষ্টির বার্তাবহ- এ কথাটাই নজরুল বলতে
চেয়েছেন। তাহলে করোনাভাইরাসের এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর এটা কি আশা করা যায়,
এই বিশ্ব মহামারীর পর মানবসভ্যতা বেঁচে থাকবে? মনুষ্যজীবন টিকে থাকবে?
লন্ডনের এক পত্রিকায় এক কলামিস্ট লিখেছেন, ‘আমার ধারণা ছিল, বিশ্ব ও মানবসভ্যতা একদিন ধ্বংস হবে আণবিক যুদ্ধ দ্বারা, যা পরিগণিত হবে তৃতীয় মহাযুদ্ধরূপে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই তৃতীয় মহাযুদ্ধ আসন্ন।
এখন দেখা যাচ্ছে, মানবসভ্যতা ধ্বংস হবে আরও ভয়ংকর জীবাণু-যুদ্ধে। আণবিক যুদ্ধ হলে হবে মানুষে মানুষে। একটি দেশের বিরুদ্ধে আরেকটি দেশের যুদ্ধ। কিন্তু এই জীবাণু বা বিজানু যুদ্ধ তো মানুষে মানুষে যুদ্ধ নয়। এ যুদ্ধ বিশ্ব মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যুদ্ধ (A war between nature and humanity)। প্রকৃতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে মানবতা টিকবে কি?’
এই প্রশ্নের জবাব পণ্ডিতরা নানাভাবে দিচ্ছেন। তাতে আশাবাদ রয়েছে। আমি পণ্ডিত নই। একজন নগণ্য মানুষ। কিন্তু ইতিহাস আমার মনে যে অভিজ্ঞান তৈরি করেছে তা থেকে বলতে পারি, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ তো যুদ্ধ করছে সেই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে। বারবার মানুষ যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। এবারও হবে। কিন্তু বারবার এই যুদ্ধে যেমন মানবতা ও তার সমাজ-সভ্যতার চেহারা ও চরিত্র বদলে গেছে, এবারেও তেমনি বদলে যাবে।
নজরুল বলেছেন, ‘ধ্বংস নূতন সৃজন-বেদন।’ বিশ্বজুড়ে এই মৃত্যু-মহামারীর মধ্যেও আমরা সেই সৃজন-বেদন অনুভব করি। আজ হোক, কাল হোক- এই ‘সৃজন-বেদন’ যেদিন চলে যাবে, সেদিন নতুন সৃষ্টির উল্লাসভরা নব প্রসূতি আমরা দেখতে পাব।
রাহুল সাংকৃত্যায়ন তার বিখ্যাত ‘ভলগা টু গঙ্গা’ উপন্যাসে প্রাগৈতিহাসিক মানবসভ্যতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার যুদ্ধজয়ের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। আমরা জানি, এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই কীভাবে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েই মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছে। আশ্রয়ের জন্য ঘর বানাতে জেনেছে। শিকারের জন্য অস্ত্র বানানো শিখে ফেলেছে। তারপর আরও কত কী!
এই ধ্বংস ও সৃষ্টির উদাহরণ তো আধুনিক ইতিহাস থেকেও দেয়া যায়। ক্রুসেডের যুদ্ধ বিশ্বে ফিউডাল বা সামন্তবাদী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে। কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ক্যাপিটালিজম ও ক্যাপিটালিস্টিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপে সামন্তবাদ ধ্বংস হয়।
উপনিবেশবাদ প্রচণ্ড আঘাত পায়। ইউরোপে বহু নেশন স্টেট তৈরি হয়। এশিয়া ও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় পশ্চিমা উপনিবেশবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর অসংখ্য স্বাধীন নেশন এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর সামন্তবাদী শেষ সাম্রাজ্য অটোম্যান অ্যামপায়ার সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ইরাকি, তুর্কি, সৌদি, সিরিয়ান ইত্যাদি বহু স্বাধীন জাতির জন্ম হয়।
এই যুদ্ধগুলো হয়েছে মানুষে মানুষে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়। পাশাপাশি মানুষকে প্রকৃতির বিরুদ্ধেও যুদ্ধে জয়ী হতে হয়েছে। প্লেগ, কলেরা, বসন্তের মহামারী, পরবর্তী সময় ক্যান্সার, ইবোলা, এইচআইভি’র হামলায় মনুষ্যসমাজ যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছে। তবে এই শেষোক্ত ভাইরাস ইবোলা, এইচআইভি ইত্যাদির যুদ্ধ ও শক্তিগুলোর রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি থেকেও ছড়িয়েছে বলে অনেক বিজ্ঞানী তাদের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
বর্তমান করোনাভাইরাস সম্পর্কেও একই সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে। তারা বলছেন, চীন ও আমেরিকা এবং সম্ভবত ইসরাইলও জীবাণু বা রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে তাদের গোপন গবেষণাগারে অসংখ্য বিপজ্জনক জীবাণু নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। তাতে দুর্ঘটনায় কোনো এক বা একাধিক ভাইরাস গবেষণাগারের টিউব থেকে বাইরে ছড়িয়েছে এবং সারা বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে।
কথাটা আমেরিকা বা চীন কেউই স্বীকার করছে না। কিন্তু আমরা দেখেছি, অতীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে চেরনোবিল আণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রে দুর্ঘটনার ফলে বিশ্বের এক বিশাল এলাকায় আণবিক তেজস্ক্রিয় ও বিপজ্জনক ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যে বিশাল রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ, তার প্রমাণ- ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আমেরিকা প্রেসিডেন্ট সাদ্দামকে এই রাসায়নিক অস্ত্র সরবরাহ করেছিল।
সাদ্দাম হোসেন এই অস্ত্র ব্যবহার করায় ১৫ লাখ ইরানির মৃত্যু হয়েছিল। এই রাসায়নিক অস্ত্র ও নিউক্লিয়ার অস্ত্রে যে বিশাল মজুদ রয়েছে আমেরিকার হাতে, তা অবিলম্বে ধ্বংস করে ফেলার জন্য নিউক্লিয়ার অস্ত্রবিরোধী আন্দোলন এখন আবার জোর দাবি তুলেছে। কারণ, এই অস্ত্রের গবেষণাগারে যদি একটি দুর্ঘটনাও ঘটে, তাতে সারা বিশ্বে ধ্বংসের তাণ্ডব শুরু হয়ে যেতে পারে।
মানবসৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ থামিয়ে দিতে পারে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ। যেমন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর আমেরিকা ছাড়া বিশ্বের আর কোনো রাষ্ট্রের হাতে আণবিক বোমা ছিল না, তখন আমেরিকার যুদ্ধবাজ দুই প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এবং আইসেনহাওয়ার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নয়াচীনসহ তখনকার সমাজতান্ত্রিক শিবিরকে ধ্বংস করার জন্য একটি আণবিক যুদ্ধ শুরু করার পাঁয়তারা করেছিল।
আণবিক বোমার ব্যবহার দ্বারা কোরিয়া যুদ্ধকে সম্প্রসারণের চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। বিশ্বব্যাপী গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠায় এবং বিশ্ব শান্তি আন্দোলন শক্তিশালী জনসমর্থন পাওয়ায় ট্রুম্যান আণবিক বোমা ব্যবহারের হুমকি দিয়েও পিছিয়ে যান। কোরিয়া যুদ্ধ বন্ধ করার অঙ্গীকার করে জেনারেল আইসেনহাওয়ারকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে হয়েছিল।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষ যুদ্ধ করে আসছে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। জয়ীও হয়েছে। যদিও তার সমাজসভ্যতা তাতে বদলে গেছে। তার উন্নতি ঘটেছে। বাংলাদেশে ঝড়, বন্যা, প্লাবনে অনেক দেশ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তুরস্ক ও জাপানের ভূমিকম্পে এমনকি আমেরিকা ও ব্রিটেনের বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ছোটবড় দেশের মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে।
কিন্তু এই বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ ভাইরাস সংক্রমণে কে কার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াবে? এবার শুধু অঞ্চলবিশেষের মানুষ আক্রান্ত নয়, গোটা মানবতা আক্রান্ত। বিশ্বের মানুষ যে আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে, ইতঃপূর্বে আর কখনও সেই আতঙ্কের মধ্যে বাস করেনি।
আগেই বলেছি, করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ। কিন্তু এই ভাইরাস মানুষই ছড়িয়েছে। বোতলবন্দি দৈত্যকে নিজের ভুলে মুক্ত করে এক দরিদ্র জেলে যেমন বিপদে পড়েছিল, আজ তেমনি বোতলবন্দি ভাইরাস দানবকে নিজেদের লোভে ও ভুলে মুক্তি দিয়ে গোটা মানবসভ্যতা ও মানবতা বিরাট বিপদে পড়েছে। রূপকথার জেলে তবু বুদ্ধি খাটিয়ে দৈত্যকে আবার বোতলে বন্দি করতে পেরেছিল। কিন্তু বিশ্বমানবতার মাথায় এই বিপদ থেকে বেরোনোর কোনো কৌশল জানা নেই।
নিজেদের লোভ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্যই যে বৃহৎ শক্তি দুটো এই ভাইরাসকে গবেষণাগার থেকে মুক্তি দিয়েছে, তারা প্রথমে এর ভয়ংকর বিপদ সাধারণ মানুষের কাছে লুকানোর চেষ্টা করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনে ও ইরানে এই ভাইরাসে প্রথম হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পরও তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা সামান্য ফ্লু, দু’দিনেই সেরে যাবে।’ এরপর আমেরিকায়ও যখন এই ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়, তখন এই রোগ প্রতিরোধের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে শুরু করেছেন।
ট্রাম্প এখন বলছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মন্দা বা ইকোনমিক ডিপ্রেশন শুরু হতে যাচ্ছে, তা হবে এই ভাইরাস মহামারীর চেয়েও ভয়ংকর।’ একই কথা বলছেন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের কিছু অর্থনীতিবিদও। করোনাভাইরাসের ওষুধ যেমন এখনও আবিষ্কৃত হয়নি, তেমনি আসন্ন ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা প্রতিরোধেরও কোনো উপায় ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতিবিদেরা খুঁজে বের করতে পারেননি।
এই শতকের গোড়ায় ইউরোপ ও আমেরিকায় যে মন্দা দেখা দিয়েছিল, তার প্রতিকার জানার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট তৎকালীন ব্রিটেনের লেবার দলীয় প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। ব্রিটেনের এই আধা সোশ্যালিস্ট প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অর্থনৈতিক রোগমুক্তির জন্য কিছু সোশ্যালিস্ট প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন এবং নিজেও তা গ্রহণ করেছিলেন।
ওই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী মুক্তবাজার অর্থনীতির মাথায় কিছুটা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে, ধ্বংসের মুখে পড়া ব্যাংকগুলোকে ব্যবস্থা গ্রহণে কাঁড়ি কাঁড়ি সরকারি অর্থ দিয়ে ধনতন্ত্র রক্ষা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ধনবাদের অন্যতম প্রধান মুখপত্র লন্ডনের টাইমস পত্রিকা পর্যন্ত এ ব্যাপারে এই বলে মন্তব্য করেছিল, Capitalism survived by Socialist Prescription (অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক চিকিৎসা দ্বারা ধনবাদের রোগমুক্তি)।
ব্রিটেনের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এক অর্থনীতিবিদ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ভাইরাস-পরবর্তী বিধ্বস্ত বিশ্বে আসন্ন ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে কিছুটা নয়, ভালোভাবেই সমাজতান্ত্রিক প্রতিকারের পন্থা ধনতান্ত্রিক বিশ্বকে গ্রহণ করতে হবে।
তখনই দেখা যাবে ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে থেকে স্ফিংসের মতো নতুন বিশ্ব আবার বেরিয়ে আসবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন কিছু সমাজবিজ্ঞানী। তারা বলেছেন, এই ভাইরাস বিশ্বমানবতাকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু চরম বিলুপ্তি ঘটাতে পারবে না। তার ভগ্নাংশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। যে সমাজতন্ত্রকে এখন পরিত্যক্ত ও লুপ্ত মনে করা হচ্ছে, সেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সহায়তায়ই বিশ্ব অর্থনীতির পুনর্গঠন চলবে।
নতুন সমাজব্যবস্থা তৈরি হবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যেমন ব্যাপকভাবে নারীমুক্তি ঘটেছিল, ব্যক্তিস্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদের জন্য কবর রচিত হয়েছিল, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত নতুন মানবসমাজ গঠনের পথ তৈরি হয়েছিল, তেমনি এই ভাইরাস সংক্রমণের মহাধ্বংসযজ্ঞ থেকে যে বিশ্ব বেঁচে উঠবে তাতে ধনতন্ত্র থাকবে, কিন্তু তার বিষদাঁত ভেঙে যাবে।
নতুনভাবে সাহসী সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটবে। নতুনভাবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তার প্রকৃত চেহারাটা আমরা এখনও দেখতে পাচ্ছি না বটে, কিন্তু শিগগিরই দেখতে পাব। বিপদ যত প্রচণ্ড হয়, তার মুক্তিটাও আসে ততটা প্রবলভাবে।
লন্ডন, ২৮ মার্চ, রোববার, ২০২০
লন্ডনের এক পত্রিকায় এক কলামিস্ট লিখেছেন, ‘আমার ধারণা ছিল, বিশ্ব ও মানবসভ্যতা একদিন ধ্বংস হবে আণবিক যুদ্ধ দ্বারা, যা পরিগণিত হবে তৃতীয় মহাযুদ্ধরূপে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই তৃতীয় মহাযুদ্ধ আসন্ন।
এখন দেখা যাচ্ছে, মানবসভ্যতা ধ্বংস হবে আরও ভয়ংকর জীবাণু-যুদ্ধে। আণবিক যুদ্ধ হলে হবে মানুষে মানুষে। একটি দেশের বিরুদ্ধে আরেকটি দেশের যুদ্ধ। কিন্তু এই জীবাণু বা বিজানু যুদ্ধ তো মানুষে মানুষে যুদ্ধ নয়। এ যুদ্ধ বিশ্ব মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যুদ্ধ (A war between nature and humanity)। প্রকৃতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে মানবতা টিকবে কি?’
এই প্রশ্নের জবাব পণ্ডিতরা নানাভাবে দিচ্ছেন। তাতে আশাবাদ রয়েছে। আমি পণ্ডিত নই। একজন নগণ্য মানুষ। কিন্তু ইতিহাস আমার মনে যে অভিজ্ঞান তৈরি করেছে তা থেকে বলতে পারি, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ তো যুদ্ধ করছে সেই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকে। বারবার মানুষ যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। এবারও হবে। কিন্তু বারবার এই যুদ্ধে যেমন মানবতা ও তার সমাজ-সভ্যতার চেহারা ও চরিত্র বদলে গেছে, এবারেও তেমনি বদলে যাবে।
নজরুল বলেছেন, ‘ধ্বংস নূতন সৃজন-বেদন।’ বিশ্বজুড়ে এই মৃত্যু-মহামারীর মধ্যেও আমরা সেই সৃজন-বেদন অনুভব করি। আজ হোক, কাল হোক- এই ‘সৃজন-বেদন’ যেদিন চলে যাবে, সেদিন নতুন সৃষ্টির উল্লাসভরা নব প্রসূতি আমরা দেখতে পাব।
রাহুল সাংকৃত্যায়ন তার বিখ্যাত ‘ভলগা টু গঙ্গা’ উপন্যাসে প্রাগৈতিহাসিক মানবসভ্যতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার যুদ্ধজয়ের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। আমরা জানি, এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই কীভাবে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ থেকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েই মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছে। আশ্রয়ের জন্য ঘর বানাতে জেনেছে। শিকারের জন্য অস্ত্র বানানো শিখে ফেলেছে। তারপর আরও কত কী!
এই ধ্বংস ও সৃষ্টির উদাহরণ তো আধুনিক ইতিহাস থেকেও দেয়া যায়। ক্রুসেডের যুদ্ধ বিশ্বে ফিউডাল বা সামন্তবাদী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে। কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ক্যাপিটালিজম ও ক্যাপিটালিস্টিক রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়। মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপে সামন্তবাদ ধ্বংস হয়।
উপনিবেশবাদ প্রচণ্ড আঘাত পায়। ইউরোপে বহু নেশন স্টেট তৈরি হয়। এশিয়া ও আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় পশ্চিমা উপনিবেশবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর অসংখ্য স্বাধীন নেশন এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম মহাযুদ্ধের পর সামন্তবাদী শেষ সাম্রাজ্য অটোম্যান অ্যামপায়ার সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ইরাকি, তুর্কি, সৌদি, সিরিয়ান ইত্যাদি বহু স্বাধীন জাতির জন্ম হয়।
এই যুদ্ধগুলো হয়েছে মানুষে মানুষে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়। পাশাপাশি মানুষকে প্রকৃতির বিরুদ্ধেও যুদ্ধে জয়ী হতে হয়েছে। প্লেগ, কলেরা, বসন্তের মহামারী, পরবর্তী সময় ক্যান্সার, ইবোলা, এইচআইভি’র হামলায় মনুষ্যসমাজ যুদ্ধ করে জয়ী হয়েছে। তবে এই শেষোক্ত ভাইরাস ইবোলা, এইচআইভি ইত্যাদির যুদ্ধ ও শক্তিগুলোর রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি থেকেও ছড়িয়েছে বলে অনেক বিজ্ঞানী তাদের সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
বর্তমান করোনাভাইরাস সম্পর্কেও একই সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকে। তারা বলছেন, চীন ও আমেরিকা এবং সম্ভবত ইসরাইলও জীবাণু বা রাসায়নিক যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে তাদের গোপন গবেষণাগারে অসংখ্য বিপজ্জনক জীবাণু নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। তাতে দুর্ঘটনায় কোনো এক বা একাধিক ভাইরাস গবেষণাগারের টিউব থেকে বাইরে ছড়িয়েছে এবং সারা বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে।
কথাটা আমেরিকা বা চীন কেউই স্বীকার করছে না। কিন্তু আমরা দেখেছি, অতীতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে চেরনোবিল আণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রে দুর্ঘটনার ফলে বিশ্বের এক বিশাল এলাকায় আণবিক তেজস্ক্রিয় ও বিপজ্জনক ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যে বিশাল রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ, তার প্রমাণ- ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আমেরিকা প্রেসিডেন্ট সাদ্দামকে এই রাসায়নিক অস্ত্র সরবরাহ করেছিল।
সাদ্দাম হোসেন এই অস্ত্র ব্যবহার করায় ১৫ লাখ ইরানির মৃত্যু হয়েছিল। এই রাসায়নিক অস্ত্র ও নিউক্লিয়ার অস্ত্রে যে বিশাল মজুদ রয়েছে আমেরিকার হাতে, তা অবিলম্বে ধ্বংস করে ফেলার জন্য নিউক্লিয়ার অস্ত্রবিরোধী আন্দোলন এখন আবার জোর দাবি তুলেছে। কারণ, এই অস্ত্রের গবেষণাগারে যদি একটি দুর্ঘটনাও ঘটে, তাতে সারা বিশ্বে ধ্বংসের তাণ্ডব শুরু হয়ে যেতে পারে।
মানবসৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ থামিয়ে দিতে পারে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ। যেমন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর আমেরিকা ছাড়া বিশ্বের আর কোনো রাষ্ট্রের হাতে আণবিক বোমা ছিল না, তখন আমেরিকার যুদ্ধবাজ দুই প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান এবং আইসেনহাওয়ার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নয়াচীনসহ তখনকার সমাজতান্ত্রিক শিবিরকে ধ্বংস করার জন্য একটি আণবিক যুদ্ধ শুরু করার পাঁয়তারা করেছিল।
আণবিক বোমার ব্যবহার দ্বারা কোরিয়া যুদ্ধকে সম্প্রসারণের চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। বিশ্বব্যাপী গণপ্রতিরোধ গড়ে ওঠায় এবং বিশ্ব শান্তি আন্দোলন শক্তিশালী জনসমর্থন পাওয়ায় ট্রুম্যান আণবিক বোমা ব্যবহারের হুমকি দিয়েও পিছিয়ে যান। কোরিয়া যুদ্ধ বন্ধ করার অঙ্গীকার করে জেনারেল আইসেনহাওয়ারকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হতে হয়েছিল।
প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষ যুদ্ধ করে আসছে সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে। জয়ীও হয়েছে। যদিও তার সমাজসভ্যতা তাতে বদলে গেছে। তার উন্নতি ঘটেছে। বাংলাদেশে ঝড়, বন্যা, প্লাবনে অনেক দেশ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তুরস্ক ও জাপানের ভূমিকম্পে এমনকি আমেরিকা ও ব্রিটেনের বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেও ছোটবড় দেশের মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে।
কিন্তু এই বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ ভাইরাস সংক্রমণে কে কার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াবে? এবার শুধু অঞ্চলবিশেষের মানুষ আক্রান্ত নয়, গোটা মানবতা আক্রান্ত। বিশ্বের মানুষ যে আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে, ইতঃপূর্বে আর কখনও সেই আতঙ্কের মধ্যে বাস করেনি।
আগেই বলেছি, করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ। কিন্তু এই ভাইরাস মানুষই ছড়িয়েছে। বোতলবন্দি দৈত্যকে নিজের ভুলে মুক্ত করে এক দরিদ্র জেলে যেমন বিপদে পড়েছিল, আজ তেমনি বোতলবন্দি ভাইরাস দানবকে নিজেদের লোভে ও ভুলে মুক্তি দিয়ে গোটা মানবসভ্যতা ও মানবতা বিরাট বিপদে পড়েছে। রূপকথার জেলে তবু বুদ্ধি খাটিয়ে দৈত্যকে আবার বোতলে বন্দি করতে পেরেছিল। কিন্তু বিশ্বমানবতার মাথায় এই বিপদ থেকে বেরোনোর কোনো কৌশল জানা নেই।
নিজেদের লোভ ও আধিপত্য বিস্তারের জন্যই যে বৃহৎ শক্তি দুটো এই ভাইরাসকে গবেষণাগার থেকে মুক্তি দিয়েছে, তারা প্রথমে এর ভয়ংকর বিপদ সাধারণ মানুষের কাছে লুকানোর চেষ্টা করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনে ও ইরানে এই ভাইরাসে প্রথম হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পরও তাচ্ছিল্য দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা সামান্য ফ্লু, দু’দিনেই সেরে যাবে।’ এরপর আমেরিকায়ও যখন এই ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়, তখন এই রোগ প্রতিরোধের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করতে শুরু করেছেন।
ট্রাম্প এখন বলছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মন্দা বা ইকোনমিক ডিপ্রেশন শুরু হতে যাচ্ছে, তা হবে এই ভাইরাস মহামারীর চেয়েও ভয়ংকর।’ একই কথা বলছেন প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের কিছু অর্থনীতিবিদও। করোনাভাইরাসের ওষুধ যেমন এখনও আবিষ্কৃত হয়নি, তেমনি আসন্ন ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা প্রতিরোধেরও কোনো উপায় ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতিবিদেরা খুঁজে বের করতে পারেননি।
এই শতকের গোড়ায় ইউরোপ ও আমেরিকায় যে মন্দা দেখা দিয়েছিল, তার প্রতিকার জানার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট তৎকালীন ব্রিটেনের লেবার দলীয় প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। ব্রিটেনের এই আধা সোশ্যালিস্ট প্রধানমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অর্থনৈতিক রোগমুক্তির জন্য কিছু সোশ্যালিস্ট প্রেসক্রিপশন দিয়েছিলেন এবং নিজেও তা গ্রহণ করেছিলেন।
ওই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী মুক্তবাজার অর্থনীতির মাথায় কিছুটা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে, ধ্বংসের মুখে পড়া ব্যাংকগুলোকে ব্যবস্থা গ্রহণে কাঁড়ি কাঁড়ি সরকারি অর্থ দিয়ে ধনতন্ত্র রক্ষা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ধনবাদের অন্যতম প্রধান মুখপত্র লন্ডনের টাইমস পত্রিকা পর্যন্ত এ ব্যাপারে এই বলে মন্তব্য করেছিল, Capitalism survived by Socialist Prescription (অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক চিকিৎসা দ্বারা ধনবাদের রোগমুক্তি)।
ব্রিটেনের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এক অর্থনীতিবিদ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ভাইরাস-পরবর্তী বিধ্বস্ত বিশ্বে আসন্ন ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকাতে কিছুটা নয়, ভালোভাবেই সমাজতান্ত্রিক প্রতিকারের পন্থা ধনতান্ত্রিক বিশ্বকে গ্রহণ করতে হবে।
তখনই দেখা যাবে ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে থেকে স্ফিংসের মতো নতুন বিশ্ব আবার বেরিয়ে আসবে। এই ভবিষ্যদ্বাণীও করেছেন কিছু সমাজবিজ্ঞানী। তারা বলেছেন, এই ভাইরাস বিশ্বমানবতাকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু চরম বিলুপ্তি ঘটাতে পারবে না। তার ভগ্নাংশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে। যে সমাজতন্ত্রকে এখন পরিত্যক্ত ও লুপ্ত মনে করা হচ্ছে, সেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সহায়তায়ই বিশ্ব অর্থনীতির পুনর্গঠন চলবে।
নতুন সমাজব্যবস্থা তৈরি হবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যেমন ব্যাপকভাবে নারীমুক্তি ঘটেছিল, ব্যক্তিস্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদের জন্য কবর রচিত হয়েছিল, ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত নতুন মানবসমাজ গঠনের পথ তৈরি হয়েছিল, তেমনি এই ভাইরাস সংক্রমণের মহাধ্বংসযজ্ঞ থেকে যে বিশ্ব বেঁচে উঠবে তাতে ধনতন্ত্র থাকবে, কিন্তু তার বিষদাঁত ভেঙে যাবে।
নতুনভাবে সাহসী সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটবে। নতুনভাবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তার প্রকৃত চেহারাটা আমরা এখনও দেখতে পাচ্ছি না বটে, কিন্তু শিগগিরই দেখতে পাব। বিপদ যত প্রচণ্ড হয়, তার মুক্তিটাও আসে ততটা প্রবলভাবে।
লন্ডন, ২৮ মার্চ, রোববার, ২০২০

No comments:
Post a Comment