Saturday, March 28, 2020

করোনা: যেভাবে বদলে দেবে বিশ্বব্যবস্থা



 





উনবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব বেশ কয়েকবার ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে গেছে। যুদ্ধ, মহামারি, সন্ত্রাসী হামলা সেসব পরিবর্তনের উপজীব্য হিসেবে কাজ করেছে৷ পরিবর্তন হয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এমনকি সামরিক ভাবনায়ও৷ বিশ্ব পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ বড় দুই ঘটনা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানী ও অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্বের পতন হয়ে উত্থান ঘটে বৃটেন ও ফ্রান্সের। সমসাময়িক স্প্যানিশ ফ্লু’র মহামারি নারীকে পেটের দায়ে দুয়ার ভেঙে বাইরে বের হতে বাধ্য করেছিল৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবির্ভাব ঘটে উদারবাদী তত্ত্বের। উড্রো উইলসনের বিখ্যাত ১৪ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিহার করে বিশ্ব শান্তির পক্ষে বিশ্ব একমত হয়েছিল৷

কিন্তু ১৯৪৫ এর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্বেকার সকল পরিবর্তনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়৷ নতুন পরিবর্তনে সারা বিশ্বে বৃটেন, ফ্রান্সের উপনিবেশ ভেঙে পড়ে৷ বিশ্ব রাজনীতিতে উত্থান হয় নতুন মোড়ল আমেরিকা ও রাশিয়ার। উদারবাদী তত্ত্বকে ব্যর্থ দাবি করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্থান ঘটে বাস্তববাদী তত্ত্বের। জাতিসংঘ গঠনসহ নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রগুলো সামরিক খাতে বিনিয়োগ বাড়ায়।

পরবর্তীতে ৭০ ও ৮০ এর দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নব্য উদারবাদ ও নব্য বাস্তববাদের উত্থান ও সমন্বয় ঘটে৷ ফলে বেশ কিছু আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সামরিক জোট গঠন হয়৷ ঠাণ্ডা যুদ্ধের পতনের পর নব্য বাস্তবতবাদ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে৷ আলোচনায় আসে ‘ক্লাশ অব সিভিলাইজেশ্যন’' তত্ত্ব। নাইন/ইলাভেন হামলার পর বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ইসলামোফোবিয়ার মারাত্মক বিস্তার লাভ করে।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সকল পরিবর্তনকে ছাড়িয়ে যাবে বিশ্বজুড়ে মহামারি কোভিড-১৯ এর বিস্তার ও রোধকল্পে বিশ্বের ব্যর্থতা৷

প্রশ্নবিদ্ধ হবে বিশ্ব নেতৃত্ব:
কোভিড-১৯ এর বিস্তার ইউরোপ-আমেরিকাসহ পরাক্রমশীল দেশসমূহের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে৷ যে ইতালি সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে ওস্তাদ সে ইতালি তার নাগরিককে বাঁচাতে পারেনি এই মহামারি থেকে৷ আফ্রিকা চুষে নিয়ন্ত্রণ করা ফ্রান্স, নতুন মোড়ল হওয়ার স্বপ্ন দেখা জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছে৷ বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ রাজপরিবারের উত্তরসূরি প্রিন্স চার্লসকে এই ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারেনি বৃটেন। আক্রান্ত হয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন৷ এতবড় মহামারির দিনে বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে পায়নি ইউরোপ। বরং যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সীমান্ত বন্ধ করে দেয় ইউরোপের সাথে৷ এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোও একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারেনি৷ এই প্রথমবার ইউরোপ দেখল ন্যাটো জোট, মিসাইল তাকে বাঁচাতে পারছে না৷ জনগণ দেখল ডলারের বিনিময়ে মানুষ বাঁচতে পারছে না৷ অসহায়ভাবে মানুষ মরছে৷ এসব ঘটনা ইউরোপ-আমেরিকায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে দেবে। ন্যাটো জোট, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়বে৷ তবে যেহেতু সার্ক দেশসমূহ এই ভাইরাস প্রতিরোধ ফাণ্ড গঠন করেছে সুতরাং সার্কের ভবিষ্যত সম্পর্ক মজবুত হবে৷ এছাড়া জি-২০ যে ফাণ্ড গঠন করতে যাচ্ছে তাও আলোর মুখ দেখাবে বৈশ্বিক সম্পর্কে।

কোভিড-১৯ যখন চীনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল তখন এসব দেশ ভাবতেও পারেনি পরবর্তী ‘হটস্পট’ হতে যাচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগরের দুইপাড়৷ চীনের ক্রান্তিকালে ট্রাম্প বরং তাচ্ছিল্যের সুরে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিল। চীন এত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে বহিঃবিশ্বে সহযোগিতা নিয়ে যাবে এটাও অকল্পনীয় ছিল। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা বলছে কোভিড-১৯ এর পরবর্তী ‘হটস্পট’ হতে যাচ্ছে নিউইয়র্ক। ইতিমধ্যে একদিনে ১৫ হাজার আক্রান্তের মধ্যদিয়ে ভাইরাস সংক্রমণে চীন, ইতালিকে পেছনে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

আন্ত:রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পরিবর্তন ও নতুন স্নায়ুযুদ্ধ:
কোভিড-১৯ এর প্রতিরোধে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অসহযোগিতা পরবর্তী সময়ে আন্ত:রাষ্ট্রীয় সম্পর্কে পরিবর্তন আসবে৷ ভাইরাস মোকাবেলায় চীন ও জাপান ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে৷ আমেরিকার পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক৷ অন্যদিকে অর্ধশত বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় থাকা কিউবা প্রতিষেধক আবিষ্কার, সাগরে ভাসমান আক্রান্ত রোগীর জাহাজকে নিজ দেশে ভিড়তে দিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতালিতে ডাক্তার পাঠিয়ে কিউবা প্রমাণ করেছে বন্ধুত্বের জন্য সামরিক জেট বিমান নয়, ডাক্তারই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিশ্বব্যাপী শত্রু-মিত্রের ধারণা বদলে যাবে৷ এছাড়া কিউবার এই ভূমিকা অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতিতে ছোট দেশগুলোর গুরুত্ব বাড়াবে৷ একদেশ থেকে অপর দেশে ছড়িয়ে পড়া আরব দেশগুলোতে পারস্পরিক সংঘাত কমে আসবে৷ তারা একই সাগরের পাড়ের বাসিন্দা এই বোধদয় তৈরী হবে৷ যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইউরোপ নয়, তাদের কর্তৃত্বে থাকা অন্যান্য দেশের পাশেও দাঁড়াতে পারেনি৷ অন্যদিকে চীন নিজ দেশের পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বহির্বিশ্বে ডাক্তার ও মেডিকেল সরঞ্জাম নিয়ে রওনা দিয়েছে৷ এছাড়া চীনা আলিবাবা বাংলাদেশসহ এশিয়া, ইউরোপের অর্ধশতাধিক দেশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। পরবর্তী সময়ে আলিবাবা জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে রুপ নিবে কোন সন্দেহ নেই৷ করোনা পরবর্তী বিপর্যস্ত পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রণের লড়াই নিয়ে আমেরিকা-চীনের মধ্যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হবে৷ এই স্নায়ুযুদ্ধে চীন আপাতত এগিয়ে থাকলেও ভাইরাস সংক্রমণে চীনের দায়কে বারবার বিশ্বকে মনে করিয়ে দিতে চাইবে যুক্তরাষ্ট্র। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কোভিড-১৯ কে বলছে ‘চাইনিজ ভাইরাস’।

সামরিক খাত নয় বাজেট বাড়বে জনস্বাস্থ্য খাতে:
আমেরিকা যখন আফগানিস্তানে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধে লিপ্ত হয় তখন ৪০টা দেশে নিয়োজিত ৫৪ টি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের বাজেট ব্যয় হয় ৭-৮ বিলিয়ন ডলার৷ এতদিন বিশ্ব বাজেট করেছে যুদ্ধের জন্য, শান্তির জন্য নয়৷ কিন্তু এবার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় শক্তিশালী অনেক দেশকে মাস্ক ও সাধারণ মেডিকেল যন্ত্রপাতির জন্য অন্য দেশের দিকে হাত বাড়াতে হয়েছে। ফলে পরবর্তী বিশ্বে বাজেট হবে জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে। এতদিন তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র কিছু দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এর তর্জন-গর্জন। পরিবর্ত সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, রেডক্রসসহ জনস্বাস্থ্য নির্ভর সংগঠনের গুরুত্ব বাড়বে৷ যুক্তরাষ্ট্রে ওবামার স্বাস্থ্য বিল ফের আলোচনায় আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব চ্যালেঞ্জ ও নতুন ভাইরাসের রোধকল্প নিয়ে অনুজীব বিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণা বৃদ্ধি পাবে৷ মহামারিতে বিপর্যস্ত দেশসমূহ সামরিক বাজেট কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি করে নিরপেক্ষ দেশে পরিণত হবে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সহযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সামরিক খাতের গুরুত্ব কমিয়ে আনবে।

ধর্ম চর্চা ও চিন্তায় পরিবর্তন:
পোপ ফ্রান্সিস করোনা সন্দেহে টেস্ট করাতে বাধ্য হয়েছেন। জনসস্মুখ থেকে বিদায় নিয়েছেন তিনি৷ সৌদি আরবে অবস্থিত মুসলমানদের দুই পবিত্র মসজিদ মক্কা-মদিনা লকডাউন করে দেয়া হয়েছে ৷ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোও মসজিদ বন্ধ রেখেছে৷ ইরান ও ভারতে বহু ধর্মীয় পবিত্র যাত্রা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে৷ ভাইরাসের আক্রমণ দীর্ঘায়িত হলে চলতি বছর মানব ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে হজ্জ্ব পালিত হতে পারে৷ ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই ভবিষ্যতে ধর্ম পালনের পাশাপাশি জ্ঞান অর্জন ও গবেষণায় জোর আসবে।

যোগাযোগ প্রযুক্তি:
মানুষ দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি। এই বন্দিত্ব বাড়বে। কিন্তু মানুষ কতদিন ঘরে বসে থাকবে! মানুষ যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বাড়িতে অফিস করা, স্কাইপিতে ইন্টারভিউ, মিটিং সেরে নেয়াতে অভ্যস্থ হয়ে ওঠছে৷ এসব অভ্যস্থতা মানুষকে করোনা পরবর্তী সময়ে অফিসের ধারণায় পাল্টে দিতে পারে৷ বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের স্কুল-কলেজ বন্ধ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের একটি টিভি চ্যানেলে মাধ্যমিকের ক্লাস নেয়া হচ্ছে। ইউজিসি অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি কার্যক্রম চালাতে ইতিমধ্যে নির্দেশ দিয়েছে৷ এভাবে বন্দিত্ব বাড়তে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইনে ক্লাস, লেকচার এমনকি পরীক্ষা নেয়ার কথাও ভাববে বিশ্ব৷ যদি এই ব্যবস্থায় একবার অভ্যস্থ হয়ে যায় বিশ্ব তবে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও ব্যাপক পরিবর্তন আসবে৷ তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবের বিস্তার পরবর্তীতে এই খাতে সেন্সরশীপে ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসবে৷

বিশ্ব বাণিজ্য ও ভোক্তার পরিবর্তন:
বিশ্বের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন পুরোই অনিশ্চিত। ভাইরাসের এই সংক্রমণ কবে কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা অনুমান করাও দুঃসাধ্য। ইতিমধ্যে ইউরোপের বিখ্যাত প্রাইমমার্ক কোম্পানি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। এভাবে বহু বড় বড় প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে৷ অনলাইনে মানুষের কেনাকাটা বাড়বে৷ সামনের ইদ পর্যন্ত যদি এই সংক্রমণ চলতে থাকে তবে পুরা বিশ্বে অনলাইনে শপিং এক বিরাট বাস্তবতায় রুপ নিবে। আলীবাবাসহ অনলাইন কোম্পানিগুলো এই বাজার দখল করে নিবে৷ সুখবর আসবে বাংলাদেশের অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। সেক্ষেত্রে বড় বড় শপিংমল লোকসান তো গুনবেই বরং প্রয়োজনীতাও হারাতে পারে৷ মানুষের বিলাসী পণ্যের চাহিদা কমে আসবে৷ স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য দু’টোই বাড়বে৷

কোভিড ভাইরাস এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ৷ চীন, ইউরোপের পর এখন দ্রুত ছড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। এর শেষ কোথায় বিশ্ব আন্দাজও করতে পারছে না৷ বিশ্ব দেখেছে প্রিন্স চার্লস থেকে দরিদ্র দেশের নাগরিক কেউ পৃথিবীর দুর্যোগ থেকে মুক্ত নয়, সুতরাং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের মতো করোনা পরবর্তী সময়ে একটি মানবিক ও শান্তির পৃথিবীর ডাক দেয়া হবে৷ সে ডাক কে দিবে বা পরবর্তী পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ কারা নেবে এখনি বলা যাচ্ছে না৷ তবে এটা ঠিক ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্বের কাঠামোগত ওলট–পালট ঘটতে চলেছে।

(লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী।) মানব জমিন

No comments:

Post a Comment