
করোনা দুর্যোগের চেয়ে অর্থনৈতিক দুর্যোগটা বেশি মারাত্মক হবে— এ কথা দুটো কারণে বলছি। প্রথমত, লকডাউনের জেরে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন ইতিমধ্যেই। তাঁদের অবস্থা ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। এবং লকডাউনের সময়সীমা যত বাড়বে, ওই কাজ হারানো শ্রেণির অবস্থা ততই কঠিনতর হবে। দ্বিতীয়ত, করোনা পরিস্থিতিকে যদি সময় মতো নিয়ন্ত্রণ করে নেওয়া যায়, তা হলে আক্রান্তের সংখ্যাকে যে অঙ্কের মধ্যে আমরা বেঁধে ফেলতে পারব বলে আমাদের আশা, লকডাউন পরবর্তী আর্থিক দুর্যোগের শিকার কিন্তু হবেন তার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ।
করোনা দুর্যোগ চলাকালীন সঙ্কটটা যে চেহারায় রয়েছে বা থাকবে, তার কথাই আগে বলি। এই সময়ের সঙ্কটটার মোকাবিলা করার জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহটা অব্যাহত রাখাই সবচেয়ে জরুরি। অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মী যাঁরা, রোজকার মজুরির ভরসায় দিন কাটে যাঁদের বা কাজ না করে দিনের পর দিন ঘরে বসে থাকার সামর্থ নেই যাঁদের, এখন সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে তাঁদের। হাতে টাকাপয়সার টানাটানি। এই সময়ে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের জোগান বা সরবরাহ যদি কমে যায়, তা হলে আচমকা দাম বাড়তে শুরু করবে। ফলে বিরাট অংশের মানুষ অত্যাবশ্যকীয় পণ্যও জোগাড় করতে পারবেন না। তাই ওই সব পণ্যের জোগান এবং সরবরাহে যাতে ছেদ না পড়ে, সে দিকে সরকারকে এখন নজর রাখতে হবে। সরকার সেই নজরটা রাখছেও।
শুধু জোগান বা সরবরাহ পর্যাপ্ত রাখলে চলবে না। গরিব মানুষের হাতে টাকাও পৌঁছে দিতে হবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের জোগান ও সরবরাহ যে সরকার এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে, তার একটা কারণও রয়েছে। কারণটা হল মন্দা। এই করোনা দুর্যোগ আসার আগেও আমাদের দেশে বেশ কিছু দিন ধরে একটা আর্থিক মন্দা চলছিল। ফলে পণ্য উৎপাদিত হলেও খুব বেশি বিক্রি হচ্ছিল না। অনেক দিন ধরে বিক্রিবাটায় ভাটা চলছিল বলে সেই সময়ে উৎপাদিত অনেক পণ্যই মজুত হয়ে থেকে গিয়েছিল। সেটা কিন্তু আমাদের জন্য কার্যত শাপে বর হল। অনেক দিন ধরে মজুত হতে থাকা পণ্য এখন বাজারে আসছে। লকডাউনের জেরে অনেক জিনিসের উৎপাদন বন্ধ, অনেক জিনিসের উৎপাদন কম হচ্ছে। তাই পণ্যের জোগানে টান পড়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু পণ্য আগে থেকে মজুত ছিল বলে এখনও সেই অভাবটা অনুভূত হয়নি। ফলে জিনিসপত্রের দাম সে ভাবে বাড়েনি। লকডাউন যত দিন চলবে, তত দিনই কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং অত্যাবশ্যক পণ্যের জোগানটা সরকারকে এ ভাবেই পর্যাপ্ত রাখতে হবে।
তবে শুধু জোগান বা সরবরাহ পর্যাপ্ত রাখলে চলবে না। গরিব মানুষের হাতে টাকাও পৌঁছে দিতে হবে। লকডাউন কত দিন চলবে, আমরা কেউ জানি না। একুশ দিনেই যদি মিটে যায়, তা হলে হয়তো ধীরে ধীরে আবার সব স্বাভাবিকতার দিকে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু একুশ দিনেই লকডাউন তুলে নেওয়া যাবে, না কি তার পরেও অনির্দিষ্ট কাল অপেক্ষায় থাকতে হবে, এখনও কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ফলে এক দিকে মজুত পণ্যের ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম বাড়বে। আবার অন্য দিকে নিম্নবিত্তের হাতে সঞ্চিত অর্থও (যেটুকু রয়েছে) শেষ হয়ে যাবে। ফলে উৎপাদন চালু করে পণ্যের সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রেখেও কোনও লাভ হবে না। কারণ বাজারে পণ্য থাকলেও বিরাট অংশের মানুষের হাতে তা কেনার মতো টাকা থাকবে না। লকডাউন ঘোষিত হওয়ার পর থেকে অনেকেরই কাজ নেই। এঁদের মধ্যে কারও কারও সঞ্চয় রয়েছে। তা দিয়ে কিছু দিন হয়তো চলছে বা চলবে। কিন্তু অনির্দিষ্ট কাল চালিয়ে নেওয়ার মতো সঞ্চিত অর্থ গরিব মানুষের কাছে থাকে না। তাই আজ না হোক কাল, সঞ্চয় শেষ হবেই। আর যাঁদের সেটুকু সঞ্চয়ও নেই, তাঁরা ইতিমধ্যেই সমস্যার মুখে পড়তে শুরু করেছেন। এঁদের সবার হাতেই এ বার টাকা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাটা করতে হবে সরকারকে। না হলে দেশকে খুব বড় দুর্ভিক্ষের মুখে পড়তে হতে পারে।
যে দুর্ভিক্ষের কথা বলছি, তা কিন্তু একটা অদ্ভুত দুর্ভিক্ষ। বাজারে পণ্য থাকবে। কিন্তু তা কেনার জন্য পয়সা থাকবে না একটা বিরাট অংশের মানুষের হাতে। এ রকম পরিস্থিতি এক বার কিন্তু ওড়িশায় তৈরিও হয়েছিল। বাজারে প্রচুর জিনিসপত্র ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের অনেকেরই ক্রয়ক্ষমতা ছিল না। অমর্ত্য সেনের একটা বইতে সেই পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ মেলে।
সুতরাং সরকারকে যেটা করতেই হবে, তা হল, এই অভুক্ত মানুষদের হাতে টাকাটা পৌঁছে দিতে হবে। যাতে করোনায় মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে অনাহারে মৃত্যুর পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
এখন এই টাকা দেওয়ার বিষয়টা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটা বিতর্ক রয়েছে। টাকা দেওয়া উচিত, নাকি খাদ্য পৌঁছে দেওয়া উচিত? বিতর্কটা তা নিয়েই। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলেন, নগদ টাকা দিলে অনেক ক্ষেত্রেই তা পরিবারের কর্তা ছাড়া অন্যদের কাজে লাগে না। যাঁর নামে সরকার টাকা দিচ্ছে, তিনি হয়তো নানা বাজে খরচ করে টাকা নষ্ট করে দিচ্ছেন, ফলে গোটা পরিবারটা ভুগছে বা অভুক্ত থাকছে। তাই খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া ভাল বলে অনেকের মত।
কিন্তু খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিলেই কি সে সমস্যা মিটে যাবে? পরিবারের কর্তা যদি ওই রকম বেহিসেবি বা বেপরোয়া হন, তা হলে তো সরকারের কাছ থেকে পাওয়া চাল বাজারে বিক্রি করে দিয়েও তিনি পয়সাটা বাজে খরচ করে নষ্ট করে ফেলতে পারেন। সুতরাং টাকা দিয়ে দেওয়াই ভাল বলে অনেকে মনে করেন।
এখন যে আপৎকালীন অবস্থা চলছে, তাতে এই ধরনের সূক্ষ্ম তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার কোনও জায়গা কিন্তু নেই। খাদ্যই হোক বা টাকা, গরিব মানুষের হাতে তা দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে এ বার। কিন্তু সমস্যাও রয়েছে। কারণ সরকারের কাছে যতটা টাকার সংস্থান এখন রয়েছে, তার প্রায় পুরোটাই করোনার বিরুদ্ধে লড়তে বেরিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার নানা সরঞ্জাম তৈরি করা, যত বেশি সম্ভব ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা, এমন নানা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে গরিব মানুষের হাতে নিয়মিত টাকা পৌঁছে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে রাজকোষ নেই। তা হলে কী ভাবে টাকা দেওয়া যাবে? অনেক অর্থনীতিবিদ বলছেন, সরকার টাকা ছাপিয়ে গরিব লোকের হাতে টাকা পৌঁছে দিক। এই ধরনের আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অর্থনীতির সবচেয়ে পুরনো পন্থাগুলোর অন্যতম হল এই প্রস্তাব।
টাকা না ছাপিয়েও অবশ্য বাজারে টাকার জোগান অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।
টাকা ছাপিয়ে বাজারে টাকার জোগান বাড়ানোর পন্থা নিয়ে অবশ্য একটা প্রশ্ন থাকে। সেটা হল মুদ্রাস্ফীতির প্রশ্ন। এতগুলো টাকা এ ভাবে আচমকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়লে জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে না কি?
আমার মতে, এখনই সেটা নিয়ে ভেবে লাভ নেই। আগে দুর্ভিক্ষ ঠেকানো দরকার। সুতরাং আগে গরিব মানুষের হাতে টাকা দেওয়া হোক। তার পরে বাকিটা সামলে নেওয়া যাবে। এমনিতেও এখন সারা পৃথিবীতে তেলের দাম বেশ কম। ফলে সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েই আমরা মুদ্রাস্ফীতিকে কিছুটা হজম করে নিতে পারব। আর মুদ্রাস্ফীতি তখন হয়, যখন বাজারে জিনিসপত্রের অভাব থাকে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে জিনিসপত্রের জোগান তো রয়েছে। সুতরাং লকডাউন চললেও ওই জোগানটা অক্ষুণ্ণ রেখে আমরা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি।
টাকা না ছাপিয়েও অবশ্য বাজারে টাকার জোগান অক্ষুণ্ণ রাখা যায়। ইদানীং সরকার টাকার জোগানটা নিয়ন্ত্রণ করছিল সুদের হার কমিয়ে-বাড়িয়ে। অর্থাৎ সহজ কথায় বলতে হলে, সুদের হার বেশি থাকলে ব্যাঙ্কে টাকা গচ্ছিত রাখার প্রবণতা বাড়ে। সুতরাং বাজারে টাকার জোগান কমে। আর সুদের হার কমালে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেওয়ার উৎসাহ বাড়ে। বাজারে টাকার জোগান বাড়ে।
কিন্তু এখন যে পরিস্থিতি, তাতে ওই পদ্ধতি কাজে আসবে না। সুদের হার কমে গেলে এক শ্রেণির লোক ব্যাঙ্ক থেকে বেশি লোন নেবেন। কিন্তু সেই শ্রেণি তো গরিব নয়। সোজা কথায় বললে, আমাদের দেশে তো গরিব শ্রেণির পক্ষে ওই ভাবে ঋণ পাওয়া সম্ভব হয় না। ঘরে খাবার কেনার পয়সা নেই, ব্যাঙ্কে গেলাম খাবার কেনার জন্য ঋণ নিতে, ব্যাঙ্ক ঋণ দিয়ে দিল— এ রকম ব্যবস্থা তো আমাদের নেই। সুতরাং সুদের হার কমালে বাজারে টাকার জোগান বাড়বে ঠিকই। কিন্তু সে টাকা গরিব মানুষের হাতে পৌঁছবে না।
অতএব সরকারকেই প্রত্যক্ষ ভাবে দায়িত্বটা নিতে হবে। সরাসরি গরিব মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দিতে হবে। আপাতত এইটাই আমরা দেখতে চাই। করোনা দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে আসার পরে অন্য কোনও পদ্ধতির কথা ভাবা যেতে পারে। কিন্তু আপাতত এইটাই করা উচিত। সূত্র: আনন্দবাজার
লেখক: অর্থনীতিবিদ
No comments:
Post a Comment