জয়নাল আবেদীন
ভগীরতের মতো চিন্তিত আরও অনেক কৃষক। একদিকে নগদ টাকা না থাকায় সেচ মেশিনের জ্বালানি কিনতে পারছেন না তারা, অন্যদিকে করোনা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হওয়ার আশঙ্কায় ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি আবহাওয়ার বিরূপ আচরণের আশঙ্কাও রয়েছে তাদের।
কৃষক ভগীরত বলেন, 'ছয় বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছি। মনটা খুব ফুরফুরে ছিল। এবার ফলনও ভালো হয়েছে। এরই মধ্যে করোনার হানা। সেচটা কোনোমতে চালিয়ে যাচ্ছি; কিন্তু ধান কাটার শ্রমিক কোথায় পাব? ধান ঘরে তুলব কী করে? এসব চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।'
বিভিন্ন জেলার কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তাদের অনেকেই কৃষিকাজের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। ভিন্ন পেশা থেকে উপার্জিত অর্থের বড় অংশই ব্যয় করেন কৃষিতে। ২৬ মার্চ থেকে সবকিছু বন্ধ থাকায় তাদের জমানো টাকা শেষ হয়ে গেছে। ফলে অনেকে সেচের জন্য জ্বালানি কিনতে পারছেন না। কেউ কেউ ধারদেনা করে কয়েকদিন চালিয়েছেন। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় এখন আর ঋণও পাচ্ছেন না।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ধান কাটা এবং শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আর সার্বিকভাবে মাঠ তত্ত্বাবধানের জন্য জরুরি ভিত্তিতে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের প্রয়োজনে মাস্ক, স্যানিটাইজার ও পিপিই দিতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য কৃষি উপকরণ কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, সরকার প্রথমেই কৃষক ও শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে হাওর এলাকায় ধান কাটার মেশিন পাঠানো হয়েছে। অন্যান্য এলাকায় বোরো ধান ঘরে তোলার সামগ্রিক বিষয় দেখভালের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটার শ্রমিকরা যাওয়ার পথে যেন তাদের কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্নিষ্ট এলাকার প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, বোরোর পর আউশ ধানের উৎপাদন বাড়াতে এক লাখ ৯ হাজার ২৬৫ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে প্রণোদনা হিসেবে ৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকার রাসায়নিক সার ও বীজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বলছেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধান কেটে ঘরে তোলা। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সারাদেশের কৃষকদের জন্য প্রায় ৮০০টি ধান কাটার মেশিন (কম্বাইন হার্ভেস্টার) কেনা হয়েছে। হাওরাঞ্চলে ধান কাটার মৌসুম আগে শুরু হয়। সেখানে ইতোমধ্যে ২০০টি মেশিন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ধান কাটার শ্রমিকরা যেন অবাধে যাতায়াত করতে পারেন, সে বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, চলতি বছর সারাদেশে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে। এ থেকে বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় দুই কোটি চার লাখ ৩৬ হাজার টন, যা সব ধরনের ধান উৎপাদনমাত্রার ৫৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান (জেনেটিক রিসোর্স সিড) ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, সেচের চ্যালেঞ্জ হয়তো কাটিয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু ধান ঘরে তোলা নিয়ে সত্যিই বড় সংকট তৈরি হবে এবার। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। আবার কোথাও কোথাও শ্রমিক পাওয়া গেলেও দেখা যাবে তারা করোনার স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। সব মিলিয়ে বিভিন্ন সংকট দেখা দিতে পারে।
মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কাজ করেন ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর বাংলাদেশ ইন ডেভেলপমেন্টের (সিসিডিবি) কৃষি সমন্বয়কারী সমীরণ বিশ্বাস। তিনি জানান, বোরো ধানের এখন থোড় আর ফ্লাওয়ারিং হওয়ার সময়। এ সময় সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। তারও চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কৃষকের জন্য ডিজেলের দাম অর্ধেকে নামিয়ে আনা অথবা কৃষি বিভাগ থেকে সহায়তা দেওয়া। কারণ অনেক কৃষকেরই এখন উপার্জন বন্ধ।
বোরোর আশানুরূপ ফলন হয়েছে জানিয়ে সমীরণ বিশ্বাস বলেন, বোরো ধানের একটি বড় অংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চলে। প্রতিবছরই সেখানে শ্রমিক সংকট থাকে। এবার করোনার কারণে তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। আগাম বন্যায় যাতে হাওর অঞ্চলের পাকা ধান শ্রমিক সংকটে তলিয়ে না যায়, তার প্রস্তুতিও নিতে হবে এখনই।
সরকারের নির্দেশনা :করোনাভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতে ধান কাটার সময় কৃষি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাওর এলাকায় আগমন ও চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সংশ্নিষ্টদের অনুরোধ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির সময়ে হাওর এলাকায় ধান কাটাসহ সারাদেশে কৃষি উৎপাদন ও বিপণন অব্যাহত রাখতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে মাঠপর্যায়ে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও অনুসরণ করতেও বলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এসব নির্দেশনা জারি করা হয়।
কৃষি সল্ফপ্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এ বছর বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২০ ভাগ জোগান দেবে হাওরাঞ্চল। হাওরের সাত জেলা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বোরো আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে এবং শুধু হাওরে চার লাখ ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে। হাওরাঞ্চলে বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার টন।
No comments:
Post a Comment