Wednesday, April 8, 2020

ফেসবুকে সাড়া দিয়ে মাঠে ২০০০ স্বেচ্ছাসেবক

ফেসবুকে সাড়া দিয়ে মাঠে ২০০০ স্বেচ্ছাসেবক
করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বগুড়ার রাস্তায় সচেতনতামূলক বার্তা লিখছেন স্বেচ্ছাসেবকরা- সমকাল
দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বগুড়ার তিন সাংবাদিক-সংস্কৃতিকর্মী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। জনসচেতনতা সৃষ্টি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা ও অসহায়দের খাদ্য সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তারা। এজন্য তাদের উদ্যোগে প্রথমে 'করোনা ও বগুড়া পরিস্থিতি' নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ চালু করা হয়। সেখানে একটি পোস্ট দিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা।

২১ মার্চ এই গ্রুপ চালুর সময় তারা ভাবতেও পারেননি যে এমন সাড়া মিলবে। দুই সপ্তাহে গ্রুপের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় নয় হাজার। তাদের মধ্যে প্রায় দুই হাজার সদস্য এখন বগুড়ার ১২টি উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। স্থানীয়

প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে সহায়তা করছেন তারা।

গতকাল মঙ্গলবার থেকে চালু করা হয়েছে একটি হটলাইন (০১৯৫১ ৫০০৮০০) যে নম্বর থেকে মিলবে তাদের সব সেবা। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য ২০ চিকিৎসক ও পাঁচ স্বেচ্ছাসেবকের সমন্বয়ে খোলা হয়েছে 'র‌্যাপিড রেসপন্স টিম'। জেলার যে কোনো স্থান থেকে ডাক পেলে ছুটে যাবেন টিমের সদস্যরা। আর ২৪ ঘণ্টা মোবাইল ফোনে দেওয়া হচ্ছে 'টেলিমেডিসিন সেবা'। এ ছাড়া করোনা পরিস্থিতিতে অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারকে গোপনে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানোর বা অসহায়-হতদরিদ্রদের প্রয়োজনীয় সহায়তার কার্যক্রম তো আছেই।

করোনাবিষয়ক ফেসবুক গ্রুপটির প্রধান সমন্বয়ক সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক রাকিব জুয়েল সমকালকে বলেন, বিভিন্ন দুর্যোগে একক বা সমন্বিতভাবে মানুষকে সহায়তা করেন অনেকেই। ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে সেই মানুষদের সংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই গ্রুপের সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় সচেতনতা তৈরির কাজ শুরু করেন। তারা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানের সামনে নির্দিষ্ট দূরত্বে বৃত্ত এঁকে ক্রেতাকে সেখানে দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করতে অনুরোধ করেন। ত্রাণ বিতরণ বা ওএমএসের পণ্য বিক্রির সময় হুড়াহুড়ি না করে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ানোর কথা বলেন। তবে এখন কেন্দ্রীয়ভাবে সবকিছু সমন্বয় করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে এই স্বেচ্ছাসেবকদেরও নানা রকম কাজে লাগানো হচ্ছে। আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও তারা মানুষের জন্য কাজ করছেন। লক্ষ্য একটাই, কেউ যেন অনাহারে না থাকেন, বিনা চিকিৎসায় না কষ্ট পান।

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির বগুড়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন রাকিব জুয়েল। তিনি জানান, পেশাগত কাজের পাশাপাশি সেবামূলক এই উদ্যোগে শুরু থেকেই তার সঙ্গে আছেন যমুনা টেলিভিশনের বগুড়া ব্যুরোপ্রধান মেহেরুল সুজন ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের জেলা প্রতিনিধি ফরহাদুজ্জামান শাহী। কাজের পরিধি বেড়ে চলায় এখন নয় সদস্যের জেলা সমন্বয় টিম গঠন করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের চলাচলের সুবিধার্থে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে দেওয়া হচ্ছে পরিচয়পত্র। এতে প্রধান সমন্বয়কের পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকছে। মূলত সহৃদয় বিত্তবান মানুষের সহায়তায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি সদস্যরাও অনেকে নিজের সাধ্যমতো সহায়তা করছেন। প্রশাসনও কিছু ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করছে বা এ কাজে তাদের সাহায্য নিচ্ছে।

গ্রুপটির আরেক উদ্যোক্তা সাংবাদিক মেহেরুল সুজন বলেন, পর্যাপ্ত খাদ্যপণ্যের মজুদ না থাকায় বেছে বেছে উপযুক্ত ব্যক্তি-পরিবারকে সহায়তা দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ, যারা মুখ ফুটে শোচনীয় অবস্থার কথা বলতে পারছেন না, তাদের সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে। স্থানীয় এক সংস্কৃতিকর্মী গত সোমবার ফোন করে বিব্রত কণ্ঠে তার অসহায়ত্বের কথা জানান। তার পরিবারে সবাই নারী সদস্য। গ্রুপের নিয়ম অনুযায়ী সাহায্যপ্রার্থীর তথ্য যাচাই করে গোপনে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। আবার গত রোববার শাজাহানপুর উপজেলার ১৭ বছরের এক অটোরিকশাচালককে সহায়তা দেওয়া হয়। তিনি অসুস্থ অবস্থায় রিকশা চালাচ্ছিলেন। তার কাছ থেকে জানা যায়, তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা থাকেন। মা-বোনের চার সদস্যের পরিবার চলে তার আয়ে। এখন লোক চলাচল তেমন না থাকায় আয়ও নেই। তবু অসুস্থ অবস্থাতেই তাকে পথে বের হতে হয়েছে। তার তথ্য যাচাই করার পর পরিবারটির এক সপ্তাহ চলার মতো খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেন স্বেচ্ছাসেবকরা।

রাকিবুল ইসলাম জানান, স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য তেমন কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। নিজের উদ্যোগে সংগ্রহ করা মাস্ক-গ্লাভস পরে সমন্বয়কদের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেকে নিজের এলাকায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে তারা কাজ করছেন। করোনা নিয়ে নানা মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ঠেকাতেও তৎপর রয়েছেন তারা।

No comments:

Post a Comment