Friday, April 10, 2020

অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, পারবে তো বাংলাদেশ?







২০১৪-১৫ সালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬টি ভেন্টিলেটর স্থাপন করা হয়। এখন ২০২০ সাল। এই দীর্ঘ সময়েও সেই কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র বা ভেন্টিলেটর চালু করা যায়নি। লোকবলের অভাবে সেটা করা সম্ভব হয়নি দাবি করেছেন হাসপাতালটির সরকারী পরিচালক ডা. মো. শাহফুজুর রহমান। অথচ, পৃথিবীর ওপর জেকে বসা করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) বিরুদ্ধে লড়াই করতে ‘চূড়ান্ত ঢাল’ হিসেবে প্রয়োজন এই ভেন্টিলেটর। কিন্তু বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার অনুপাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে (বিবিসি বাংলা, ৯ এপ্রিল ২০২০)।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে সরকারিভাবে খোঁজা হচ্ছে, দেশে কোন কোন হাসপাতালে সেই ভেন্টিলেটর রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, শুধু ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, করোনার চিকিৎসায় ঢাকার বাইরে ৬৩টি জেলায় কোনো ভেন্টিলেটর সুবিধা নেই (বণিক বার্তা, মার্চ ২৬, ২০২০)।
এই করোনাভাইরাসকে বলা হচ্ছে অদৃশ্য শক্তি বা শত্রু। একে মোকাবিলা করার মতো পৃথিবীতে এখনো কোনো অস্ত্র (ওষুধ বা প্রতিষেধক) আবিস্কার হয়নি। তবে কিছু কার্যকরী উদ্যোগের মাধ্যেম এই ভাইরাসের প্রকোপ থেকে বেঁচে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো, আক্রান্ত সন্দেহ হলে কোয়ারেন্টিনে রাখা, আক্রান্ত হলে আইসোলেনে নেওয়া। এর বাইরে দেশকে অবরুদ্ধ করে রাখা, যাতে করে মানুষ ঘরের বাইরে না আসে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতেও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকরী হবে, তা আগামী দিনগুলো বলে দেবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, করোনা রোগীর চিকিৎসায় ঢাকার পাঁচটি হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৫০টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। এ পাঁচটি হাসপাতালে মোট ২৯টি ভেন্টিলেশন সুবিধা আছে। আর ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসতাপালে প্রস্তুত করা ৩ হাজার ৪৬৫টি আইসোলেশন বেড রয়েছে। ঢাকার বাইরে কোনো আইসোলেশন ইউনিটে এখন পর্যন্ত ভেন্টিলেশন সুবিধা দেওয়া হয়নি।
ঢাকার বাইরে যদি কোনো রোগী করোনায় আক্রান্ত হন এবং তার অবস্থা যদি তৃতীয় পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে তাকে আইসিইউতে কৃত্তিম শ্বাস-প্রশ্বাস দিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে ওই রোগী কী করবেন? তাকে ঢাকায় আনতে হবে।  ঢাকায় আসলেই যে ওই রোগী চিকিৎসা পাবেন বা ভেন্টিলেশন সুবিধা পাবেন, সেটা বলা সত্যিই দুষ্কর। কেননা, ঢাকায় করোনা রোগীর জন্য ভেন্টিলেশন সুবিধা আছে মাত্র ২৯টি। এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।
সরকারি হিসেবে দেশে আজ শুক্রবার পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪২৪। আর মারা গেছে ২৭ জন। মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসে এই সংখ্যা সত্যি অনেক কম। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এক দিনেই ১৯৭৩ জন মানুষের প্রাণ গেছে এই ভাইরাসে। তাই আগামী দিনে বাংলাদেশে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লে কী পরিস্থিতি হবে, সেটা কেউ বলতে পারছেন না।
যদিও কোভিড–১৯ বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ বলছেন, ‘আমি মনে করছি রোগী এত বাড়বে না। সরকার বা জনগণ যেভাবে আমরা আগাচ্ছি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি, আমি আশা করি খুব দ্রুত আমরা (করোনাভাইরাস) নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে। যতটা ভয় আমরা পাচ্ছি বা জনগণও হয়তো অনেক ভয় পাচ্ছেন, আমি মনে করি আগামী কয়েক দিনে অবশ্যই অবস্থার একটা পরিবর্তন আসবে। কারণ হলো, জনগণের সচেতনতার অভাব আছে এটা ঠিক, তারপরও জনগণ অনেক সচেতন হয়েছে।’
তাহলে শেষ ভরসা আমাদের সচেতনতা। এটাই এখন দেশের মূল ‘চিকিৎসা ব্যবস্থা’। আইসিইউ, আইসোলেশন ইউনিট বা করোনা পরীক্ষা এবং চিকিৎসা দেশের সবাই পাবেন না। এ কারণে প্রয়োজন নিজে সচেতন হয়ে নিজেকে ঘরে রাখা।
সবশেষে একটি কথা, কিছু দিন আগে ফরিদপুর মেডিকেল কেনাকাটার দুর্নীতি করে বেশ আলোচায় আসে। আইসিইউ না থাকলেও সেখানকার জন্য অন্তত ৪০ গুণ বেশি দামে রোগীকে আড়াল করে রাখার ওই এক সেট পর্দা কেনা হয়। একটি পর্দার দাম ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয় (প্রথম আলো, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯)। সেই হাসপাতালের ভেন্টিলেটর অকার্যকর দীর্ঘ দিন ধরে। চিকিৎসা খাতের এমন দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে হয়তো সেই ভেন্টিলেটরগুলো এখন চালু থাকত। আর সেখানে চিকিৎসা পেতেন অনেক করোনা রোগী। হয়তো ভাগ্য ভালো হলে তাদের অনেকে বেঁচে যেতেন। তাই সময় এসেছে, এসব নিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবার।
জাকির হোসেন তমাল : সাংবাদিক

No comments:

Post a Comment