Saturday, April 25, 2020

বিষণ্ন পৃথিবীতে অচেনা রমজান

মুহাম্মাদ হেদায়াতুল্লাহ   


বিষণ্ন পৃথিবীতে অচেনা রমজান

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর কাছে একটি সম্মানিত মাস। এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে সারা দিন রোজা রাখে সবাই। সন্ধ্যাবেলায় আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দুখী-দুস্থদের ইফতার দিয়ে আতিথেয়তা মুসলিম সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাতের বেলা দল বেঁধে অংশগ্রহণ করা হয় মসজিদে অনুষ্ঠিত তারাবির নামাজে। শাবান মাসের শেষ দিন রমজানের চাঁদ দেখতে পাড়া-মহল্লার শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের নারী-পুরুষের মন হয়ে থাকে উত্সুক। অন্তরে বিরাজ করে অন্য রকম আনন্দ-উচ্ছ্বাস। এমনই ছিল যুগ যুগ ধরে চলে আসা মুসলিম সংস্কৃতির প্রতিরূপ। এ ছাড়া রমজানকে ঘিরে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোতে আছে নানা সংস্কৃতি।
কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এবারের রমজান মুসলিমদের কাছে ভিন্ন রকম এক চিত্র নিয়ে হাজির হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির দরুন সবাই এখন ঘরবন্দি। দেশে দেশে চলছে লকডাউন ও কারফিউ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে মাসখানেক ধরে। মসজিদের নামাজেও বাইরের কারো অংশগ্রহণের অনুমতি নেই। জুমার নামাজও নিজের ঘরে আদায় করছে সবাই। পৃথিবীর ব্যস্ততম স্থানগুলোতে বিরাজ করছে পিনপতন নীরবতা। নেই মানুষের কোলাহল ও পদচারণ। এমন বিমর্ষ ও অচেনা পৃথিবীতে বছর ঘুরে হাজির হয়েছে পবিত্র রমজান।
‘এমন রমজান এর আগে পালিত হয়েছে কি না আমার ঠিক মনে পড়ছে না। অতীতে বিশ্বযুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা রকম সংকটময় মুহূর্ত অতিবাহিত হয়েছে। অতীতের ইতিহাস, সাহিত্য ও বিভিন্ন আর্কাইভের নথিতে দেখা গেছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দুর্যোগসহ যেকোনো কঠিন মুহূর্তেও মুসলিমরা রমজানের সময় এলে একত্রে ইবাদত করেছেন। সম্প্রতি আলজাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়ার ইনস্টিটিউট অব দ্য মালয় ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড সিভিলাইজেশনের গবেষক ফাইজাল মুসা বিষাদময় রমজান সম্পর্কে এমনটি বলেছেন।

যেভাবে বদলে গেল রমজান
মানুষের চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ থাকায় আগের মতো এবার রমজানের দিনগুলো উদ্যাপনের সুযোগ হবে না। ভোরবেলা সাহিরর সময় খাবার খেয়ে শুরু হয় রোজা। আবার সন্ধ্যাবেলা ইফতারের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে। তবে মুসলিম সমাজে ইফতারের ব্যবস্থাপনা অনেকটা সামাজিক অনুষ্ঠানের মতো হয়ে থাকে। বিশেষত বহু স্থানে সমাজের দুস্থ-দরিদ্রদের মধ্যে ব্যাপক হরে খাবার পরিবেশন করা হয়। কিন্তু এবার সে রকম কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান হবে না। কভিড-১৯-এর সংক্রমণ প্রতিরোধে সব দেশেই সব ধরনের জমায়েত নিষেধ করা হয়েছে। সাহির ও ইফতারের সবটুকুই হবে পরিবারের সঙ্গে নিজের ঘরের ভেতর।

ঘরে তারাবি আদায়ের নির্দেশনা
বেশির ভাগ দেশে মসজিদের বদলে ঘরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি তারাবির নামাজও আদায় করতে বলা হয়েছে। সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনার  হারামাইনে জনসাধারণের উপস্থিতি ছাড়া তারাবির নামাজ সংক্ষিপ্তভাবে আদায় করা হচ্ছে। মিসরে ফতোয়া বোর্ড থেকেও ঘরে সব নামাজ আদায়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জর্দানে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায়ে বারণ করা হয়েছে। ইরানেও সম্মিলিতভাবে নামাজ আদায় এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। মালয়েশিয়ায় মসজিদে সব রকম ধর্মীয় কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানে পারস্পরিক দুই মিটার দূরত্ব বজায় রেখে মসজিদে নামাজের জন্য জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জেরুজালেমের বিখ্যাত আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ মুসলিমদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান হবে এবং সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের প্রবেশের অনুমতি থাকবে। যুক্তরাজ্যে মসজিদগুলোতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কোরআন তেলাওয়াত ও ধর্মীয় বক্তব্য সম্প্রচার করা হচ্ছে।

থাকছে না সবমুখর বাজার
মিসরে রমজানকেন্দ্রিক ইফতারসহ সব ধরনের জনসমাগমের সব কার্যক্রম নিষেধ করা হয়েছে। তা ছাড়া মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও সিঙ্গাপুরে রমজানের পুরো মাস ব্যস্ত থাকে খাদ্য ও বস্ত্রের অস্থায়ী জনপ্রিয় বাজার। এবার তা স্থাপনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হলেও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এমনটি করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হচ্ছে। তবে আবুধাবিতে রমজান উপলক্ষে সীমিত সময়ের জন্য শর্ত সাপেক্ষে শপিং মল খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তা ছাড়া প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের ১২৭টি তাঁবুতে তিন লাখ ৩৩ হাজার ইফতারের প্যাক ফ্রি বিতরণ করা হবে।

অনলাইনে সহযোগিতার আহ্বান
গরিব-দুখীদের জাকাত দেওয়া কিংবা দান করা অনেক বড় পুণ্যের কাজ। রমজানে বেশির ভাগ মুসলিম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যে এবারের রমজানে মসজিদে কিংবা কোনো ক্যাম্পে কোনো কিছু দেওয়া হবে না। বরং দরিদ্রদের ইফতার সামগ্রী ও সহযোগিতা সংস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হবে। সৌদি আরবে এবার মদিনার মসজিদে নববীতে কোনো ইফতারের ব্যবস্থা থাকবে না। নিরাপত্তাজনিত কারণে স্বাস্থ্য ও ধর্ম বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে এনজিও সংস্থাকে অনলাইনের মাধ্যমে দানের অর্থ দিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ত্রাণ কার্যক্রমের সব কিছু সুশৃঙ্খলভাবে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সম্পন্ন করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment