করোনাভাইরাস। ছবি: রয়টার্সকরোনাভাইরাসের
(কোভিড–১৯) সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে। নতুন করে দেশের আরও চারটি জেলায়
আক্রান্ত ব্যক্তি পাওয়ার খবর দিয়েছে আইইডিসিআর। জেলাগুলো হলো লক্ষ্মীপুর,
লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও ও ঝালকাঠি। এ নিয়ে গতকাল রোববার পর্যন্ত রাজধানীর
বাইরে ৩৪টি জেলায় সংক্রমণ পাওয়া গেল।
শনাক্ত হওয়া রোগীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে,
দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে এখন পর্যন্ত কেবল রাজশাহী বিভাগের কোনো জেলায়
কোভিড–১৯ আক্রান্ত হিসেবে কেউ শনাক্ত হননি। খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার
মধ্যে কেবল একটি জেলায় একজন শনাক্ত হয়েছেন। চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য
জেলায়ও আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ ঠেকাতে যেসব এলাকায় সংক্রমণ ধরা
পড়েছে, সেখান থেকে লোকজন যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
আক্রান্ত ব্যক্তি যাঁদের সংস্পর্শে গিয়েছেন, তাঁদের শনাক্ত করা
(কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং) ও কোভিড–১৯ শনাক্তের পরীক্ষা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে
যেসব জেলায় এখনো রোগী পাওয়া যায়নি, সেসব এলাকায় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত
করাসহ সুরক্ষায় জোর দিতে হবে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের
(আইইডিসিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দেশে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর
(৬২১ জন) ৫০ শতাংশই রাজধানীর বাসিন্দা। এর বাইরে বিভাগওয়ারি হিসাবে
আক্রান্তদের ৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার। রাজধানীসহ
হিসাবে ধরলে মোট আক্রান্তের ৮৫ শতাংশই ঢাকা বিভাগের। এই বিভাগের ১৩টি জেলার
মধ্যে ফরিদপুর ছাড়া বাকি ১২ জেলায় মোট ২১৬ জন শনাক্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি
শনাক্ত হয়েছেন সংক্রমণ ছড়ানোর কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত নারায়ণগঞ্জ
জেলায়, ১০৭ জন। এ ছাড়া ঢাকা জেলায় ২২ জন, মাদারীপুরে ১৯ জন, গাজীপুরে ২৩
জন, মুন্সিগঞ্জে ১৪ জন, কিশোরগঞ্জে ১০ জন শনাক্ত হয়েছেন। এর বাইরে রাজবাড়ী,
মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও শরীয়তপুরে করোনায় আক্রান্ত
শনাক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রামের ৬ জেলায় সংক্রমণ
চট্টগ্রাম বিভাগের ১১টি জেলার মধ্যে ৬টিতে সংক্রমণ পাওয়া
গেছে। এ বিভাগের চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি ১২ জন, কুমিল্লায় ৯ জন,
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬ জন ও চাঁদপুরে ৬ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
কক্সবাজার ও লক্ষ্মীপুরে একজন করে শনাক্ত হয়েছেন। তিন পার্বত্য জেলা এবং
ফেনী ও নোয়াখালীতে এখন পর্যন্ত রোগী শনাক্ত হয়নি।
রংপুরে ১৫, ময়মনসিংহে ১৪ জন
গতকাল পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে ২ দশমিক ৪১ শতাংশ রংপুর
বিভাগের। এই বিভাগের ৮টি জেলার ৫টিতে মোট ১৫ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এর
মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাইবান্ধায়, ৬ জন। গাইবান্ধাকে (সাদুল্যাপুর) সংক্রমণের
ক্লাস্টার হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইইডিসিআর। গতকাল এই বিভাগের দুটি জেলায়
প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে; ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ জন ও লালমনিরহাটে একজন। এ ছাড়া
রংপুর জেলায় ২ জন, নীলফামারীতে ৩ জন শনাক্ত হয়েছেন।
আক্রান্তদের ২ দশমিক ২৫ শতাংশ ময়মনসিংহ বিভাগের। এখানকার
চারটি জেলার সবকটিতেই সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জামালপুরে ৬, ময়মনসিংহে
৫, শেরপুরে ২ ও নেত্রকোনায় একজন মিলিয়ে ১৪ জন শনাক্ত হয়েছেন।
খুলনা, বরিশাল, সিলেটে কম
খুলনা ও বরিশাল বিভাগে অন্যান্য বিভাগের তুলনায় গতকাল
পর্যন্ত নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা কম। খুলনা বিভাগে শুধু চুয়াডাঙ্গায় একজন
রোগী শনাক্ত হয়েছেন। বরিশালের ৬টি জেলার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত বরগুনা,
ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী জেলা মিলিয়ে মোট ৭ জন শনাক্ত হয়েছেন। ঝালকাঠিতে গতকাল
প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
সিলেট বিভাগের চারটি জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জে এখনো শনাক্ত নেই। সিলেট জেলায় ২ জন এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে একজন করে শনাক্ত হয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় রোগী শনাক্ত নতুন চার জেলায়।
মোট আক্রান্তের ৮৫% ঢাকা বিভাগের।
৫.৬% চট্টগ্রাম বিভাগের। বাকিরা বরিশাল, সিলেট ও খুলনার।
রাজশাহী বিভাগের কোথাও রোগী শনাক্ত হয়নি।
মোট আক্রান্তের ৮৫% ঢাকা বিভাগের।
৫.৬% চট্টগ্রাম বিভাগের। বাকিরা বরিশাল, সিলেট ও খুলনার।
রাজশাহী বিভাগের কোথাও রোগী শনাক্ত হয়নি।
সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন দেশে লকডাউন চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য
সংস্থা বলছে, তড়িঘড়ি লকডাউন তুলে নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।
বাংলাদেশেও লকডাউন বলা না হলেও ২৬ মার্চ থেকে সরকারি, বেসরকারি সব
প্রতিষ্ঠানে ছুটি চলছে। ইতিমধ্যে ১৮টি জেলা পুরোপুরি লকডাউন (অবরুদ্ধ) করা
হয়েছে। এর মধ্যে দুটি জেলায় এখনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। এ ছাড়া রাজধানীর
বিভিন্ন এলাকা, ভবন ও গলি লকডাউন করা হয়েছে।
দেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। ওই
দিন তিন রোগীর কথা বলেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাঁদের দুজন নারায়ণগঞ্জের ও
একজন মাদারীপুরের। এরপর ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১১টি জেলায় রোগী চিহ্নিত হয়। এর
এক সপ্তাহের ব্যবধানে গতকাল পর্যন্ত দেশের অর্ধেকের বেশি জেলায় সংক্রমণ
ছড়িয়েছে। আইইডিসিআর বলছে, নতুন যেসব জেলায় সংক্রমণ পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোতে
মূলত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা গিয়েছেন। গতকাল
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সেও বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসকও বলেছেন,
নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া ব্যক্তিরা ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন,
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন বড় মনোযোগ হওয়া উচিত। এ জন্য যেখানে আক্রান্ত
ব্যক্তি আছে, সেখানে কড়াকড়ি করতে হবে। কোয়ারেন্টিন, ঘরে থাকা, কন্ট্যাক্ট
ট্রেসিং ও পরীক্ষা বাড়াতে হবে। কারও জ্বর বা মৃদু উপসর্গ দেখা গেলেও
পরীক্ষা করতে হবে। অনেক জায়গায় ক্লাস্টার থেকে লোকজন পালিয়ে যাচ্ছে। এটা
বন্ধ করতে হবে। অনেকে সামাজিক হেনস্তা হওয়ার ভয়ে পরীক্ষা করতে চান না।
মানুষের এই ভীতি ও অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে। 
No comments:
Post a Comment