বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে সমাজের বিত্তবানরা দুই-তিন মাসের জন্য ঘরে খাদ্যের মজুদ রাখলেও যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা করুণ! তবে অসহায়-দরিদ্র অন্যের কাছে হাত পেতে দুমুঠো খেয়ে-পরে কোনো রকমে বেঁচে থাকার লড়াইটা চালিয়ে যেতে পারেন। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতাও মিলছে কারও কারও ভাগ্যে।
বেচারা মধ্যবিত্তেরই হয়েছে যত মরণদশা! লোকলজ্জায় না পারছে হাত পাততে, না পারছে কাউকে কিছু বলতে। হতাশার মাঝেই এখন কেবল হাবুডুবু খাওয়া। তাই হয়তো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন ‘মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোই ধরণির আসল রূপ দেখতে পায়।’
অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা পাঁচ কোটির মতো। তবে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই নিম্নমধ্যবিত্ত। এরা বেবসরকারি অফিসে
ছোট চাকরি, ছোটখাটো ব্যবসা এবং নানা ধরনের কাজের ওপর নির্ভরশীল। তবে কিছুদিন ধরে এ শ্রেণির আয়-রোজগার এক প্রকার বন্ধ। ফলে সংসার চালানোর ব্যয়ভারসহ রয়েছে বাসাভাড়া নিয়ে উদ্বেগ।
রাজধানীর ধানম-ি এলাকায় রাস্তায় ফলের ব্যবসা করতেন জুম্মন মিয়া। তার আয় দিয়ে ভালোই চলছিল ছয়জনের সংসার। কিন্তু করোনার প্রভাবে সরকারি নির্দেশনায় দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ায় পড়েছেন মহাবিপাকে। জমানো টাকায় এতদিন সংসার চললেও এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রাতে তাই নামেন রাস্তায়।
যদি একটু সহায়তা পাওয়া যায়। কেবল জুম্মন মিয়াই নন, গভীর রাতে রাস্তায় বের হলে এমন অসংখ্য মানুষের সঙ্গেই দেখা হয়। লোকলজ্জায় তারা দিনের আলোয় কারও কাছে হাত পাততে পারেন না; তাই জীবনের তাগিদে রাতে বের হন সাহায্যের আশায়।
মীরপুরের একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক আলতাফ হোসেন (ছদ্মনাম)। স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে সংসার চলছিল ভালোই। স্কুলের বেতনের পাশাপাশি কয়েকটি টিউশনিও করতেন। কিন্তু বর্তমানে স্কুল ও টিউশনি দুটোই বন্ধ। হাতে টাকাও নেই। কিন্তু এলাকায় শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি থাকায় কারও কাছে কিছু চাইতেও পারেন না লজ্জায়।
গত রবিবার রাতে তাই এলাকা ছেড়ে এসেছিলেন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে, যদি একটু সাহায্য মেলে। এ শিক্ষক বলেনÑ ‘বাসাভাড়া আর ছোট্ট বাচ্চার খাবার জোগাতেই হিমশিম খাচ্ছি। স্বামী-স্ত্রীও দৈনিক একবেলা খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছি। এভাবে চলতে থাকলে জানি না কী হবে।’
একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করেন শিউলী খানম। পাশাপাশি জমানো টাকায় এ বছরেই কয়েকজন মিলে একটি রূপচর্চার দোকান দিয়েছেন। কিন্তু করোনা প্রাদুর্ভাবে এখন সবই বন্ধ। হাতে আর জমানো টাকা না থাকায় বেশ বিপাকেই পড়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে শিউলী বলেন, ‘আর কিছুদিন এভাবে চললে রাস্তায় নেমে ত্রাণের জন্য দাঁড়ানো ছাড়া কোনো গতি নেই। সরকারের কাছে অনুরোধÑ ত্রাণের যেন সুষ্ঠু বণ্টন হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে নয়, সবার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হোক সে খাবার।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) রিপোর্টে বলা হয়, বর্তমানে দেশে খাদ্য মজুদের পরিমাণ প্রায় ১৮ লাখ টন, গত বছরের চেয়ে যা দেড় লাখ টন বেশি। এ অবস্থায় সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে এগুলো সবার কাছে পৌঁছতে পারলে খাদ্যের সংকট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ বলছেন যাদের মাধ্যমে সরকারি খাদ্য বণ্টন হয় তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের সূত্র ধরে তা দেন। এর বাইরে এলাকার প্রভাবশালী ও পরিচিতজনদেরও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিম্নবিত্তরা লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন, যা মধ্যবিত্তের পক্ষে সম্ভব নয়।
সব সময় মধ্যবিত্তকে বুকে কষ্ট নিয়ে চলতে হয় মুখে হাসি টানিয়ে। নিজের ঘরের অভাব-অনটনের কথা আত্মমর্যাদার কারণে কাউকে বলতে পারেন না তারা। নিজেই জ্বলে পুড়ে মরতে হয়। কেউ কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে সাহায্যের জন্য দরিদ্রের কাতারে দাঁড়ালেও অনেকেই হয়তো আঙুল তুলে বলেন উনি তো ভালোই আছেন, সাহায্যের জন্য কেন এসেছেন? আসলে তাদের জন্য রাষ্ট্র, সমাজ, প্রশাসন কিংবা ব্যক্তিপর্যায় থেকেও কোনো বরাদ্দ নেই। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এমন সংকটকালেও তারা বিসর্জন দিতে পারেন না আত্মমর্যাদা। সংসার কীভাবে চলে জিজ্ঞেস করলেই বলেন ওপরওয়ালা ভালোই রেখেছেন!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে মধ্যবিত্তের নির্দিষ্ট কোনো তালিকা নেই। নিম্নবিত্তরা নানাভাবে সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেলেও এর বাইরে থেকে যান মধ্যবিত্তরা। অন্যদিকে উচ্চবিত্তের আর্থিক কোনো সমস্যা নেই। সামাজিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে মধ্যবিত্ত কারও কাছ থেকে কোনো কিছু চাইতেও পারেন না। অথচ করোনার এ প্রাদুর্ভাবে এ শ্রেণির লোকজনের সাপোর্ট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের জন্য সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া যায়। কোনো এলাকার একজন মধ্যবিত্তের মাধ্যমে আরও অনেকের অবস্থাই জানা যাবে। তাদের তালিকা করে খাবার পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে। তবে এ সহায়তার ক্ষেত্রে পাবলিসিটি করা যাবে না। আবার সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি নির্দিষ্ট কল সেন্টারও চালু করা যেতে পারে, যেখানে চাহিদার ভিত্তিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য জোগান দেওয়া হবে।
তবে খেয়াল রাখতে হবে সত্যি সত্যিই যাদের প্রয়োজন, এমন মধ্যবিত্তরাই যেন উপকারভোগী হন। কিন্তু কে করবে এটা? ইতোমধ্যেই তো বেশ কিছু স্থানে জনপ্রতিনিধিরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ তছরুপেরও অভিযোগ উঠেছে।’

No comments:
Post a Comment