প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস যেন প্রকৃতির হয়ে মানুষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে। ওলটপালট করে দিয়েছে গোটা বিশ্ব। এটাই বোধ হয় প্রকৃতির প্রতিশোধ। আমরা মানুষ এতদিন নির্বিচারে প্রকৃতির ওপর ধ্বংসলীলা চালিয়েছি; আকাশ-বাতাস বিষময় করেছি; নদনদী দূষণ করেছি। সবই আমরা করেছি সভ্যতার অগ্রগতির নামে; আমাদের ভোগবিলাসের উপকরণ জোগাতে। কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয় করে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করেছি, বড় বড় পরিকল্পনা করেছি; কাজের কাজ হয়নি কিছুই। সর্বংসহা ধরিত্রী এবার গর্জে উঠে দেখিয়ে দিচ্ছে- এ বিপুলা পৃথিবীতে মানুষ কত অসহায়!
সারা পৃথিবী আজ অবরুদ্ধ। এক দেশ থেকে আরেক দেশ দূরে থাক, নিজ দেশেও আমরা চলাচল করতে পারছি না। সবাই ঘরে বন্দি। করোনার এটাই সংক্রমণ প্রতিরোধের শ্রেষ্ঠ পন্থা। যেহেতু প্রতিদিনের প্রচণ্ড ব্যস্ততা শিকেয় তুলে এখন আমরা বাড়িতে বসে আছি; একবার ভেবে দেখি, এই করোনা আমাদের কী শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে?
যদিও জানি, ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে- ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা না নেওয়া। তবু একদিন যখন করোনার কাল কেটে যাবে, আমরা নতুন পৃথিবীতে প্রবেশ করব, তখন কি আমরা মনে রাখব কিছু কথা?
এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার কেবল মানুষের একার নয়। পশু-পাখি, জীব-জন্তু, নদী-বন- সবারই সমান অধিকার আছে এ পৃথিবীতে থাকার। আমরা আমাদের ভোগ-লালসার জন্য এসব ধ্বংস করতে পারি না। বর্তমান সময় বলে দিচ্ছে, কী করলে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমে। প্রকৃতির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেই আমাদের বাঁচতে হবে। আকাশ কি কখনও এত নীল দেখেছি আমরা? অথবা নদীর পানি এত স্বচ্ছ কিংবা বাতাস এত বিষমুক্ত?
দৈনন্দিন জীবনাচরণে এখন আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হচ্ছে। বারবার হাত ধুয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হচ্ছে। সুস্থ জীবনের জন্য, রোগ-বালাই থেকে দূরে থাকার জন্য এসব অভ্যাস কি আমরা স্বাভাবিক সময়ে বজায় রাখতে পারি না?
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ বিপদের সময়ে একে অন্যকে সাহায্য করে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিনে, দাঙ্গা বা দুর্ভিক্ষের কালে অসহায় মানুষকে সহায়তা করতে মানুষের অভাব হয়নি। এবারও আমরা দেখছি খেটে খাওয়া মানুষ, যারা দিন এনে দিন খায়, তাদের খাদ্য সহায়তা দিতে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ ব্যক্তিরা এগিয়ে এসেছেন। স্বাভাবিক সময়ে আমরা কি পারি না, আমাদের চারপাশের দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে? নিজে একা সমৃদ্ধির মধ্যে বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো আনন্দ আছে? কোনো তৃপ্তি আছে?
এখন আমরা পুরো সময়টাই পরিবারের সঙ্গে কাটাচ্ছি। নানা কাজের অজুহাতে আমরা পরিবারের সঙ্গে, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটানোর সময় কতটা কমিয়ে ফেলেছিলাম! নতুন জীবনে কি আমরা নিয়ম করে ঘরে সবাই মিলে সময় কাটাব না?
এখন উপলব্ধি করি, স্বাভাবিক জীবনে আমরা অনেক কিছুই না করলেও পারি। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে বাইরে ঘোরাঘুরি। তেমন প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বেরোনোর অভ্যাস যদি আয়ত্ত করতে পারি, তবে যানবাহনের ব্যবহার কম হবে; পরিবেশ দূষিত হবে না। ঘরে বসে লেখাপড়া করতে পারব, গান শুনতে পারব, কত কাজ গোছাতে পারব!
সাম্প্রতিক একটা অমানবিক ঘটনায় বিপর্যস্ত বোধ করেছি। পোশাক শিল্পের মালিকরা কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে হাজার হাজার কর্মীকে ঢাকা নিয়ে এলেন। চাকরি বাঁচাতে তারা হেঁটে, চরম কষ্ট করে এসে দেখলেন, কারখানার গেট বন্ধ। আরও কয়েকদিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ আচরণের দায় কে নেবে? কোনো সমন্বয় ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো? ওই দিন কি তাদের পাওনা বেতন দেওয়া যেত না?
এবার প্রধানমন্ত্রী দেশের অর্থনীতি চালু রাখার জন্য যে প্যাকেজগুলো ঘোষণা করেছেন, তা অত্যন্ত সুবিবেচনাপ্রসূত। সেখানেও কিন্তু সবেচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন পোশাক শিল্প মালিকরা। এ প্যাকেজের টাকা যেন কেবল কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য ব্যবহূত হয়- তার জন্য কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা রাখতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত বলে পোশাক শিল্প মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে।
আমাদের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি যে কৃষি- তাকে বাঁচাতে হবে। কৃষক বাঁচলে আমরা বাঁচব- এটা যেন আমরা ভুলে না যাই। গ্রামের লাখ লাখ কৃষক ও হাঁস-মুরগি-মাছের খামারিরাও সরকারের বিশেষ প্রণোদনা পাবে জেনে স্বস্তিবোধ করছি। সেদিন একজন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ লিখেছেন, সরকারের নানা প্রণোদনা থেকে ধনীরাই আরও লাভবান হবে। এটা যেন মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এখনকার সংকটময় সময়ের নায়করা হলেন আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সেবা করে চলেছেন। এদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার সীমা নেই।
এর মধ্যে আমরা প্রবেশ করেছি নতুন বছরে। আমরা নিশ্চিত- এ কৃষ্ণপক্ষের অবসান হবেই। ১৪২৭ আমাদের উপহার দেবে নতুন এক পৃথিবী। আমাদের কামনা -অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
নাট্যব্যক্তিত্ব
No comments:
Post a Comment