Tuesday, April 7, 2020

আশরাফ সিদ্দিকী


আশরাফ সিদ্দিকী

স্মৃতির সুরভিমাখা ৩টি চিঠি

পিয়াস মজিদ

আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২০, ১৫:৪৯
কবি কথাসাহিত্যিক আশরাফ সিদ্দিকীকবি কথাসাহিত্যিক আশরাফ সিদ্দিকীচিঠি-এক
পরম কল্যাণীয়েসু,
তোমার সম্পাদিত ‘ভোরের পাখি’ পেলাম। এর প্রায় প্রতিটি রচনাই প্রশংসাধন্য এবং কবিতাগুলিও খুবই প্রাণতোষিনী। মফস্বলে কত কষ্ট করে তোমরা এসব করছ—তোমাদের ধন্যবাদ। বিভিন্ন নজরুল সম্মেলনে কুমিল্লা ও দৌলতপুর গিয়েছি—এসে লিখেওছি—আছে আমার বিভিন্ন গ্রন্থে—সেই সব মুখগুলি খুব মনে পড়ে৷ অধ্যাপক লায়লা নূর, আলী হোসেন চৌধুরী, হাসান ইমাম মজুমদার—এঁদের সঙ্গে দেখা হলে আমার প্রীতি জানাবে—তাঁদের নাম আমার মুখস্থই আছে। কবি সমিতি, কুমিল্লার কথা খুব মনে পড়ে—অনেক দিন  যাওয়া হয় না—তোমরা ডাকলে যাব আবার। ভালো থেকো—সাহিত্য ও শিল্পকে তুলে ধরো—তোমাদের মঙ্গল হোক।
তোমার বাবা-মা ও স্ত্রীকে শুভেচ্ছা।
আশরাফ সিদ্দিকী।
চিঠি-দুই
কল্যাণীয়েসু,
তোমার পত্র ও ‘ভোরের পাখি’ পেলাম। এই পত্রিকার লেখাগুলি বেশ সুখপাঠ্য—মফস্বলে তোমাদের এই প্রচেষ্টা অত্যন্ত প্রশংসনীয়—যত কষ্টই হোক—কিছু বিজ্ঞাপন জোগাড় করে চালিয়ে যাবে। অধ্যাপক লায়লা নূর (স্ত্রীর দিক থেকে) আত্মীয়া—তাঁকেও শুভেচ্ছা দেবে। অধ্যাপক আমীর আলী চৌধুরী ও স্বপ্না রায়কে আমার শুভেচ্ছা দেবে। PhD-এর গবেষণা পরিচালনা ও নিজের গবেষণা—এক দণ্ড সময় দেয় না। পরে বড় পত্র দেব। তবে তোমরা লেগে থেকো, আমরা আছি। কুমিল্লার সব শিল্পী-সাহিত্যিককে প্রীতি ও শুভেচ্ছা ( তোমার হবু স্ত্রীকেও)।
ভালো থেকো। সকাল-বিকাল হেঁটে  বেড়াবে, সকালে ত্রিফলা খাবে। ঢাকা বেড়িয়ে যেয়ো।
আশরাফ সিদ্দিকী
২৬.৬.২০০৩
চিঠি-তিন
কল্যাণীয়েসু,
এইমাত্র তোমার পত্র পেলাম। তোমার পত্রে তুমি কী পড়ো, জানাওনি। আশা করি মন দিয়ে পড়ে দেশ ও মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে৷ আমি রাত-দিন নানা গবেষণা ও পত্রপত্রিকায় লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। যেকোনো দিন ১০-১২টা এবং ৫টা-৬টায় এলে দেখা হতে পারে। তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেককেই চিনি—অতীতে ওদের PhD থিসিসও দেখেছি। ক্যাম্পাসটি খুবই সুন্দর—বিশেষ করে সহস্র পাখির কলরবে উদ্বেল প্রকৃতি৷ আশা করি, তোমার বন্ধুবান্ধব-বান্ধবীসহ ভালো আছো।
শুভেচ্ছান্তে
আশরাফ সিদ্দিকী
৩০.০৮.২০০৫
২.
হ্যাঁ,এই চিঠি ৩টি আমাকেই লিখেছিলেন সদ্য প্রয়াত আশরাফ সিদ্দিকী। এখানে টুকে রাখি অমল-ধবল সেই স্মৃতিখানি।
এইতো কদিন পরই বাংলা নববর্ষ।  মনে পড়ছে, কলেজে পড়াকালেই হাতে এসেছিল আশরাফ সিদ্দিকীর ‘শুভ নববর্ষ’ বইটি। কী যে মায়ামাখা গদ্য আর অচেনা ফুলের সুরভিসম অজানা সব তথ্য! পাঠমুগ্ধ আমি কুমিল্লার এক পাঠাগার থেকে সংগ্রহ করলাম পল্লিপটভূমে লেখা তাঁর অনন্য আখ্যান ‘গুণীন’। না, তখনো পড়িনি বহুখ্যাত কবিতা ‘তালেব মাস্টার’ কিংবা ‘ডুমুরের ফুল’ শিরোনামে চলচ্চিত্রায়িত তাঁর ছোটগল্প ‘গলির ধারের ছেলেটি’।
তবে অল্পবিস্তর পড়েই ২০০৩-এ উচ্চমাধ্যমিক ফলপ্রত্যাশী আমি কুমিল্লা থেকে ঢাকায় কোন সাহসে যেন চিঠি লিখে ফেললাম আশরাফ সিদ্দিকী বরাবর। সঙ্গে দিলাম বন্ধু গোলাম কিবরিয়া তুহিন আর আমার সম্পাদিত ‘ভোরের পাখি’ সাহিত্যপত্রও। তারপর এক দুপুরে অবাক বিস্ময়ে দেখি, সে চিঠির উত্তর এল এলেবেলে আমার কাছে।
পোস্টকার্ডে চিঠি লিখতেন আশরাফ সিদ্দিকী। চিঠির ভাষা যেমন লাবণ্যমাখা, তেমনি রসে ঠাঁসা। আমি আমার ছাত্র পরিচয় চিঠিতে জানাইনি বলে তিনি কলেজপড়ুয়া আমাকে ‘বিবাহিত ভদ্রলোক’ ঠাউরে প্রথম চিঠির শেষাংশে লিখলেন ‘তোমার বাবা-মা ও স্ত্রীকে শুভেচ্ছা।’ এ কথা পড়ে আমোদপ্রাপ্ত আমি যখন ফিরতি চিঠিতে জানান দিই যে আমি তাঁর পৌত্র বা দৌহিত্র-বয়সী, তখন তিনি তার উত্তরেও ‘সবাইকে শুভেচ্ছা—তোমার হবু স্ত্রীকেও’ বলে রসবাক্য গুজে দিতে বিস্মৃত হননি।
প্রতিটি পত্রে ছোটকাগজ আর মফস্বলবাসী সাহিত্যচর্চা নিয়ে তাঁর ভালোবাসার পরিচয় স্বাক্ষরিত ছিল।
তাঁর সঙ্গে আমার শেষ পত্রালাপ আমার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অব্যবহিত পর। বাসায় যাওয়ার আন্তরিক আমন্ত্রণসূত্রে এক বিকেলে গেলাম ধানমন্ডির বিশাল আবাসে। বসার ঘরে একটা প্রমাণ সাইজের গামলায় রাখা বাহারি মারবেলের স্তূপের পাশে বসে যখন কথা বলছিলেন তিনি, তখন যেন তাঁর জীবনব্যাপী সাধনার গোটা লোকবাংলা মারবেলের বিচিত্রবর্ণের মতোই খেলা করছিল তাঁর বিচ্ছুরিত বাক্যের দরদি দ্যুতিতে। আমি যেন চাক্ষুষ করছিলাম সেই তালসোনাপুরের জীবনযুদ্ধে রক্তাক্ত তালেব মাস্টারকে কিংবা গলির ধারের সেই ভাগ্যবিড়ম্বিত ছেলেটিকে। দেশবিদেশ-ঘোরা মানুষটির কথায় যেন ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছিল তাঁর টাঙ্গাইল গ্রামের কাঁচা মাটি।
প্রয়াত আশরাফ সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার শেষ দেখা প্রথম দেখার সেই বাড়ি-প্রাঙ্গণেই, গত ১৯ মার্চ ২০২০ দুপুরে, তখন তিনি অনন্তলোকের সওয়ারি।
কবিতা-গল্প-উপন্যাস-ফোকলোর-শিশুসাহিত্য-স্মৃতিগদ্য-ভ্রমণকথার অনন্য সব বইয়ের সূত্রে যেভাবে তিনি আমাদের পাঠ-পরিসরের আয়ুসীমায় থাকবেন অনন্তজীবী৷

No comments:

Post a Comment